কলমের ছদ্মবেশে মারণাস্ত্র: ঢাকায় পেনগানের উত্থান, গোয়েন্দাদের তৎপরতা
ঢাকার অপরাধ জগতে সম্প্রতি অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিন্তু মারাত্মক প্রাণঘাতী নতুন ধরনের অস্ত্রের সন্ধান পেয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সাধারণ কলমের মতো দেখতে এবং সহজে পকেটে বহনযোগ্য এই 'পেনগান' নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। পুরান ঢাকার একটি খুনের চেষ্টায় এই অস্ত্র ব্যবহারের পর অভিযান চালিয়ে এর নেপথ্যের কারিগরদের শনাক্ত করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গুপ্তচরবৃত্তির অস্ত্রের সন্ধান
গোয়েন্দা সূত্র থেকে জানা গেছে, গুপ্তচরবৃত্তিতে ব্যবহৃত ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রের মতো কিছু অস্ত্র অপরাধীদের কাছে পৌঁছে গেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। চোরাই পথে পেশাদার অপরাধীরা এসব অস্ত্র সংগ্রহ করে থাকতে পারে। এ-কারণে গ্রেফতার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
পেনগানের বর্ণনা ও উদ্ধার
গত ৭ এপ্রিল রাজধানীর লালবাগের কোতোয়ালি থানা এলাকা থেকে কলমের মতো দেখতে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু প্রাণঘাতী অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। সাধারণ কলমের মতো পকেটে বহনযোগ্য হলেও মুহূর্তেই এটি মারণাস্ত্রে পরিণত হতে পারে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধার করা পেনগানটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ ইঞ্চি। এর মাথার অংশ পিতলের তৈরি গোলাকার এবং কলমের ক্লিপ আকৃতির অংশ ট্রিগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিচের অংশ বা নিব খুললে ভেতরে শূন্য দশমিক ২২ ক্যালিবার বুলেট ব্যবহার করা যায়।
গ্রেফতার ও তদন্তের বিস্তারিত
গত ৩ এপ্রিল পুরান ঢাকার নয়াবাজারে দিনের বেলা সংঘটিত এক গুলির ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে এই পেনগান উদ্ধার করা হয়। ওইদিন যুবদল নেতা রাসেলকে হত্যাচেষ্টায় এই ক্ষুদ্রাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অস্ত্রটি থেকে একবারে একটি বুলেট ছোড়া যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) লালবাগ বিভাগের একটি দল যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে সোহেল ওরফে কাল্লু এবং সাইমন নামে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকেই বিশেষ এই অস্ত্রটি জব্দ করা হয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তার বক্তব্য
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মো. নাসিরুল ইসলাম বলেন, "নয়াবাজারের ঘটনার পর থেকেই ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়। প্রথমে যাত্রাবাড়ী থেকে সাইমনকে এবং পরে কেরানীগঞ্জ থেকে কাল্লুকে গ্রেফতার করা হয়। কাল্লুর কাছ থেকেই পেনগানটি উদ্ধার করা হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "এটি কোনও সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্র নয়। এর আগে ঢাকায় এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের কোনও রেকর্ড পাওয়া যায়নি। অস্ত্রটি কীভাবে দেশে প্রবেশ করেছে, কারা পাচারের সঙ্গে জড়িত এবং অন্য কোথাও এর ব্যবহার হয়েছে কিনা— তা খতিয়ে দেখতে একাধিক টিম কাজ করছে।"
ঘটনার পটভূমি ও উৎস শনাক্তের চেষ্টা
আহত যুবদল নেতা রাসেলকে ৩ এপ্রিল নয়াবাজারের একটি বাসায় ডেকে নিয়ে গুলি করা হয়। পরিবারের দাবি, পরিচিতজনদের ডাকে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর একই ব্যক্তিরা তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার করা পেনগানটি একটি সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ছিল। পুলিশ সন্দেহ করছে, অস্ত্রটি ভারত অথবা পাকিস্তান থেকে পাচার হয়ে দেশে আসতে পারে। গ্রেফতার এক আসামি জানিয়েছে, অস্ত্রটি ৮০ হাজার টাকায় কেনা হয়েছিল এবং বেশি দামে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। মাদক সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই গুলির ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ উদ্বেগ
গোয়েন্দারা আরও জানান, জব্দ করা অস্ত্রে কোনও কোম্পানির লোগো বা শনাক্তযোগ্য মার্কিং নেই, ফলে এর উৎপত্তি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে খুলনায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে এ ধরনের ক্ষুদ্র অস্ত্র ব্যবহারের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দাদের মতে, আধুনিক নগর অপরাধে বড় অস্ত্রের বদলে সহজে লুকানো যায় এমন ক্ষুদ্র অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। সাধারণ জিনিসের ছদ্মবেশে থাকা এসব অস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, লিপস্টিক, মানিব্যাগ, কোমরের বেল্ট কিংবা হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যায় এমন ছোট আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অস্ত্র থেকে এক বা দুই রাউন্ড গুলি ছোড়া যায়। গুপ্তচরবৃত্তি ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় ব্যবহারের জন্য এগুলো তৈরি করা হয়। সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় এসব অস্ত্র শনাক্ত করা কঠিন হলেও গোয়েন্দারা সেগুলো চিহ্নিত করতে তৎপর রয়েছেন। বর্তমানে অস্ত্রটির উৎস ও সম্ভাব্য চোরাচালান রুট শনাক্তে কাজ করছে গোয়েন্দারা, যা ঢাকার অপরাধ জগতে নতুন ধরনের নিরাপত্তা হুমকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।



