রাজধানীতে একের পর এক খুন, সন্ত্রাস, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অপরাধ দমনে পুলিশের উপস্থিতি ও নজরদারি বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এর অংশ হিসেবে রাজধানীতে তিনটি নতুন থানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ–সংক্রান্ত প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আরও একটি থানা ও দুটি ফাঁড়ির প্রস্তাব তৈরি হচ্ছে।
নতুন থানার নাম ও অবস্থান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিএমপি সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত তিনটি থানার নাম হলো রায়েরবাজার, বসুন্ধরা ও দক্ষিণগাঁও। এগুলো চালু হলে ডিএমপিতে মোট থানার সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৩। অনেক দিন আগে পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর এখন তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা ও থানা স্থাপনসংক্রান্ত সচিব কমিটির আগামী সভায় প্রস্তাবটি তোলা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর থানার একটি অংশ নিয়ে গঠিত হবে রায়েরবাজার থানা। খিলক্ষেত, বাড্ডা ও ভাটারা থানার অংশ নিয়ে বসুন্ধরা থানা এবং সবুজবাগ ও খিলগাঁও থানার অংশ নিয়ে দক্ষিণগাঁও থানা। তবে বসুন্ধরা থানার নামকরণ নিয়ে কিছুটা দ্বিমত আছে; অনুমোদনের আগে নাম পরিবর্তনের সুযোগ থাকছে।
জনবল ও অবকাঠামো
প্রত্যেক নতুন থানার জন্য একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে ১১৯ জন করে জনবল চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে থাকবেন ৩ জন পরিদর্শক, ৪৩ জন উপপরিদর্শক, ৩৫ জন সহকারী উপপরিদর্শক ও ৪৬ জন কনস্টেবল।
ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন থানাগুলো চালু হলে বড় থানা এলাকার চাপ কমবে এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো যাবে। বিশেষ করে রায়েরবাজার, বছিলা ও জেনেভা ক্যাম্প-সংলগ্ন এলাকায় মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রবণতা বেশি।
অপরাধের চিত্র
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসে ঢাকা মহানগরে ৫৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। এ ছাড়া দস্যুতার ঘটনায় ৭২টি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৯টি, ডাকাতির ঘটনায় ১১টি, অপহরণের ঘটনায় ৫৩টি, চুরির ঘটনায় ৪৩১টি, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ১৮টি এবং ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৩৭৫টি মামলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যা, মোহাম্মদপুরে সন্ত্রাসী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দুজন খুন, এবং ছিনতাইয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং
নতুন থানা-ফাঁড়ির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। পুরো ঢাকা শহরকে ১১ হাজার সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডিএমপি ইতিমধ্যে সাত শতাধিক ক্যামেরা স্থাপন করেছে। মোহাম্মদপুরে ৭০০ সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে। গুলশান সোসাইটি প্রায় ১ হাজার ৩০০ ক্যামেরা বসিয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, গুলশানে বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় সেখানে অপরাপর তুলনামূলক কম। পুরো ঢাকা সিসিটিভির আওতায় এলে অপরাধীদের শনাক্ত করা সহজ হবে এবং অপরাধ করার সাহস কমবে।
এ ছাড়া হ্যালো ডিএমপি অ্যাপ, নাগরিক তথ্যভান্ডার, হোটেল বোর্ডার ইনফরমেশন সিস্টেম ও সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং জোরদার করা হচ্ছে।
চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান
১ মে থেকে রাজধানীতে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা ধরে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ডিএমপি। ৭ মে পর্যন্ত এক সপ্তাহে ৮৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের অংশ হিসেবে চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও অনলাইন জুয়া চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
আরও থানা-ফাঁড়ির পরিকল্পনা
নতুন তিন থানার বাইরে মোহাম্মদপুরের একটি অংশ নিয়ে বছিলা নামে আরও একটি থানা করার প্রস্তাব তৈরি করছে ডিএমপি। একই সঙ্গে বাড্ডার বেরাইদ ও গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় দুটি নতুন পুলিশ ফাঁড়ি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ডিএমপিতে ৫৭টি ফাঁড়ি রয়েছে; নতুন দুটি চালু হলে সংখ্যা হবে ৫৯।
এ ছাড়া পূর্বাচল নতুন শহরকে ডিএমপির আওতায় আনতে সরকারি আদেশ জারি হয়েছে। সেখানে ৪টি থানা, ৬টি ফাঁড়ি ও ৪১টি পুলিশ বক্স চালুর জন্য জনবল চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
জনবল সংকট
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি আরও চার হাজার পুলিশ সদস্য চেয়েছে। বর্তমানে ডিএমপিতে প্রায় ৩৩ হাজার পুলিশ সদস্য রয়েছেন। কর্মকর্তাদের মতে, রাজধানীর আয়তন, জনসংখ্যা, যানজট, রাজনৈতিক কর্মসূচি, অপরাধের নতুন ধরন ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ সামাল দিতে বর্তমান জনবল যথেষ্ট নয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে অপরাধের ধরন বদলেছে। শুধু থানাভিত্তিক গতানুগতিক পুলিশিং দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন। তাই থানা-ফাঁড়ির সংখ্যা বাড়ানো, অপরাধপ্রবণ এলাকায় পুলিশি উপস্থিতি বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, তালিকাভিত্তিক অভিযান ও বাড়তি জনবল—সব মিলিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে পুলিশের দ্রুত সাড়া, জবাবদিহি ও ধারাবাহিক অভিযানের ওপর।



