দীর্ঘ বিরতির পর জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। পুলিশ সদর দফতরের জারি করা একটি সতর্কতামূলক চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো এতদিন নীরব ছিল, এখন হঠাৎ কেন তারা আবার নড়েচড়ে বসছে?
জঙ্গিবাদের পুনরুত্থানের কারণ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, মানবাধিকার কর্মী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গিবাদ কখনও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। তারা হারিয়ে যায় না, বরং কৌশলগতভাবে সুযোগ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নিরাপত্তার দুর্বলতার অপেক্ষায় থাকে। তাদের দীর্ঘ ‘নীরবতা’ মূলত পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয়ের সময়। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করে।
আঞ্চলিক সংযোগ ও সীমান্ত ঝুঁকি
দক্ষিণ এশিয়ায় সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে মতাদর্শিক যোগাযোগের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতে লস্কর-ই-তৈয়বা (এলআইটি) ও জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) মতো সংগঠনগুলো আন্তসীমান্ত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) নামের সংগঠনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, সংগঠনটির সঙ্গে একটি নিরাপত্তা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরেও টিটিপি’র সংযোগ?
চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (বিএএফ) এক ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান মিলেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) একটি ডেরায়। এই ঘটনার পর সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্রপন্থি নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে, তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত টিটিপি’র পক্ষে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ওই সদস্য কাজ করছেন। উল্লেখ্য, টিটিপি পাকিস্তানবিরোধী এবং আফগান তালেবানপন্থি একটি সশস্ত্র নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশে টিটিপি’র উপস্থিতি নতুন নয়। ২০১৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল— ওই বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে তিন টিটিপি সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এমনকি গত বছর পাকিস্তানের সামরিক অভিযানে অন্তত চার জন বাংলাদেশি টিটিপি যোদ্ধা হিসেবে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এই ধারাবাহিকতায় এবার খোদ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যের নাম আসায় বিএএফ ঘাঁটি জহুরুল হক, এ কে খন্দকার এবং মতিউর রহমান ঘাঁটিতে কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তা তল্লাশি শুরু হয়েছে।
কারাগার থেকে পলাতক ও সাম্প্রতিক উত্থান
জঙ্গিবাদের এই সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গি সদস্য পালিয়ে যায়। পুলিশ সদর দফতরের ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, কারাগার ভেঙে পালানো ২০২ জন বন্দির মধ্যে ১৩৩ জনই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পলাতক বা জামিনে থাকা জঙ্গিদের বিষয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে বর্তমানে তাদের কাছে কোনও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইজিপি বারবার বলেছেন বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কোনও অস্তিত্ব নেই। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন বক্তব্য আসার পর মাঠ পর্যায়ে আমাদের করার কিছু থাকে না।”
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, বিগত সরকারের পতনের পর পাকিস্তানের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়া এবং মানুষের ঘনঘন পাকিস্তান ভ্রমণের বিষয়টিও বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের একজন প্রভাবশালী নেতার বাংলাদেশ সফর এবং সে বিষয়ে সরকারের নীরবতা নিয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এবং সরকারের পক্ষ থেকে ‘অস্বীকার করার সংস্কৃতি’ জঙ্গিবাদের এই নতুন উত্থানকে উসকে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীর বক্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঘটনাটির গুরুত্ব কেবল বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।” তার মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে উগ্রবাদী প্রভাব তৈরি হলে তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সম্ভাব্য যেকোনও সশস্ত্র বা উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদর দফতরের জারি করা সতর্কতা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিকে হঠাৎ কোনও ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জঙ্গিরা এই মুহূর্তে নতুন করে জন্ম নেয়নি, তারা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যবস্থার ভেতরে বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান ছিল।”
নূর খানের ভাষ্য অনুযায়ী, কৌশলগত কারণে জঙ্গি সংগঠনগুলো অনেক সময় প্রকাশ্যে সক্রিয় না থাকলেও গোপনে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে গেছে। গত দেড় বছরে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা তুলনামূলকভাবে একটি সুযোগ পেয়েছে, যার ফলে পূর্বে গড়ে ওঠা ছোট ছোট নেটওয়ার্ক আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং সারা দেশে সংগঠন পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, “জঙ্গিরা শুধু তৎপরতাই বাড়ায়নি, বরং বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতিও নিয়েছে বলে অনুমান করা যায়।” এর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে তিনি কয়েক মাস আগে কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনাকে উল্লেখ করেন। বিস্ফোরণের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং সেখানে তৈরি বিস্ফোরক দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নূর খান লিটন বলেন, “অতীতেও জঙ্গি তৎপরতায় বিভিন্ন বাহিনীর কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল। সাম্প্রতিক সময়েও কিছু বিষয় নতুন করে সামনে আসছে এবং সরকারি তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো শনাক্ত হচ্ছে।” তার মতে, জঙ্গিদের প্রস্তুতির মাত্রা বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, “সরকার যেহেতু বিষয়টি চিহ্নিত করতে পেরেছে, তাই জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
যা বললেন অতিরিক্ত আইজিপি
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ পুলিশ সবসময়ই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।” তিনি জানান, পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট, এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)-সহ বিভিন্ন ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে জঙ্গিবাদসংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছে।
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে জামিনে মুক্তি পাওয়া বেশ কয়েকজন জঙ্গি সন্দেহভাজনকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অনেককে নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।” তবে উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে কোনও পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলেও জানান তিনি।



