ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সম্প্রতি তাঁর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বকে ‘আধুনিক ইসরায়েলের’ এক নতুন রূপ দেখিয়েছেন, যা বিশ্ববাসী দেখতে চায়নি। গত কয়েক সপ্তাহে তাঁর এসব কর্মকাণ্ড তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বেন-গভিরের বিতর্কিত বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড
বেন-গভির গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ইসরায়েলের স্বার্থের পরিপন্থী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি তিনি ‘হতে দেবেন না’। পাশাপাশি তিনি ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র আন্দোলনকর্মীদেরও হয়রানি করেছেন, যার দৃশ্য টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে।
উগ্র ইহুদিবাদী বেন-গভির মূলত ইউরোপীয় আন্দোলনকর্মীদের উপহাস ও বিদ্রূপ করেছিলেন। এর কড়া সমালোচনা করেছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও কানাডা। এমনকি ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও এর নিন্দা জানিয়েছে।
নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া
এসব ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুঝতে পেরেছেন, বিষয়টি বহির্বিশ্বে ইসরায়েলের ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতি করছে। তিনি এই পুরো ঘটনাকে ইসরায়েলের ‘মূল্যবোধ ও রীতিনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়’ বলে দাবি করেছেন।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার আরও এক ধাপ এগিয়ে নিজ মন্ত্রিসভার এই সদস্যের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে অভিযোগ করেন, বেন-গভির জেনেশুনেই ইসরায়েল রাষ্ট্রের ক্ষতি করছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বেন-গভির ‘ইসরায়েলের প্রতিচ্ছবি নন’।
গভীর বিশ্লেষণ: বেন-গভির কি একা?
ইসরায়েলের অনেক গণমাধ্যম একই সুরে কথা বললেও বাস্তবতা সম্ভবত ভিন্ন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ইসরায়েলি সমাজের একটি ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী অংশ এখন বর্বর মানসিকতার বেন-গভিরকেই নিজেদের প্রতিনিধি মনে করে।
বামপন্থী ‘হাদাশ’ পার্টির নেসেট সদস্য আয়দা তৌমা-স্লিমান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘তিনি নির্বোধ। আর এটিই আমাদের বলে দিচ্ছেন, তিনি একা এসব করছেন না। তিনি যা করছেন, তা অন্য রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সাহায্যেই করছেন।’
ঘৃণাভিত্তিক রাজনীতির উত্থান
২০২২ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের জোটের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের মধ্যে একটি জোট গঠনে সহায়তা করেন। এই জোট পার্লামেন্টের তৃতীয় বৃহত্তম শক্তিতে পরিণত হয় এবং নেতানিয়াহুর জোট সরকারকে টিকিয়ে রাখে।
বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ইসরায়েলি পুলিশ বাহিনীকে নিজের কট্টর ডানপন্থী আদর্শ অনুযায়ী ঢেলে সাজিয়েছেন বেন-গভির। ফিলিস্তিনি বন্দীদের অনেককেই কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে এবং তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দম্ভ করে বলেছেন, তিনি এই বন্দীদের শোচনীয় অবস্থাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছেন।
গাজায় গণহত্যা ও আন্তর্জাতিক চাপ
গাজায় গণহত্যার তীব্রতা কমানোর কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই বেন-গভির ক্ষমতাসীন জোট সরকার পতনের হুমকি দেন। সরকারের নীতি অমান্য করে তিনি বারবার মুসলমানদের পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদে উসকানিমূলকভাবে প্রবেশ করেছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর বেন-গভিরের তদারকিতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ঢালাওভাবে বন্দুকের লাইসেন্স তুলে দেওয়া হয়, ফলে ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে একটি মৃত্যুদণ্ড বিল পাস হয়েছিল, যার আনন্দ উদ্যাপন করতে গত এপ্রিলে শ্যাম্পেনের বোতল হাতে দেখা যায় বেন-গভিরকে। সেই ভিডিও প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ইসরায়েল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি বলেন, ‘আমার মতে, তাঁকে নিশানা করা খুব সহজ। এখন এমনভাবে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে সমস্যাটি কেবল বেন-গভিরের ভিডিও পোস্ট করা নিয়ে। ফ্লোটিলা সদস্য বা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কী আচরণ করা হচ্ছে, তা যেন কোনো সমস্যাই নয়।’
ইসরায়েলি ভোট বিশ্লেষক ডালিয়া শিন্ডলিন জানান, বাস্তবিকভাবে বেন-গভিরের রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির অনেক নেতার চেয়ে খুব একটা বেশি চরমপন্থী নয়। তিনি বলেন, ‘বেন-গভির এমন এক চরম ডানপন্থী ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন, যা অনেকটা লোকদেখানো ও উসকানিমূলক সার্কাসের মতো।’
শিন্ডলিন আরও বলেন, বেন-গভিরের সমর্থকেরা মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের হুমকি মোকাবিলা করার একমাত্র উপায় হলো শক্তি প্রয়োগ এবং তাঁদের অপমান-অপদস্থ করা।
এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলোর বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য বেন-গভিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তবে তিনি এখনো কোনো সাড়া দেননি।



