অভিযান চলছে, গ্রেফতারও হচ্ছে। তবু মোহাম্মদপুরে কমছে না ছিনতাই, চুরি, মাদক কারবার কিংবা হত্যার ঘটনা। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সমস্যার মূলে না গিয়ে কেবল উপসর্গ মোকাবিলা করায় কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। অপরদিকে পুলিশ বলছে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধও। এমন বাস্তবতায় মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায় ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে— মোহাম্মদপুরের অপরাধ সামলানোর দায় কার?
ক্রমবর্ধমান সহিংসতা
চুরি, ছিনতাই, মাদক বাণিজ্য, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড— সব মিলিয়ে এলাকাটি ক্রমেই সহিংসতার স্থায়ী মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোহাম্মদপুরে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যার ঘটনা বেড়ে যায়। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও কয়েকমাস পেরিয়ে যায়। তারপরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে— মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায় আসলে কার?
বিশ্লেষকদের অভিযোগ
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মোহাম্মদপুরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো মূলত সুনির্দিষ্ট অপরাধ বা উপসর্গভিত্তিক। ফলে অপরাধের গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে অপরাধীদের এক ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্কও রয়েছে। রাজনৈতিক মহল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অংশের আশ্রয়-প্রশ্রয় অপরাধ দমনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
তবে দায় চাপানোর পথে হাঁটতে নারাজ পুলিশ। তাদের দাবি, মোহাম্মদপুরে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর তদন্ত এবং জড়িতদের গ্রেফতারে কাজ চলছে। পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়লে অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছে পুলিশ।
সর্বশেষ আলোচিত ছিনতাই
গত শনিবার (৩০ মে) রাতে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে নিজ বাসার সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন দুই বোন। বড় বোন একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং ছোট বোন মোহাম্মদপুরের একটি কলেজের এমবিএ শিক্ষার্থী। ঈদের ছুটি শেষে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় ফিরে রাত প্রায় ৩টার দিকে তারা শ্যামলী থেকে রিকশায় বাসার সামনে পৌঁছান। লাগেজ নামানোর মুহূর্তেই সেখানে হাজির হয় একটি ছিনতাইকারী চক্র। চাপাতির মুখে তাদের কাছ থেকে লাগেজ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। লাগেজে স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ এবং গ্রামের বাড়ি থেকে আনা গরুর মাংস ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসময় তাদের লাঞ্ছিতও করা হয়। পাশের একটি ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরায় পুরো ঘটনা ধারণ হয়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে তৎপরতা শুরু করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী পরিদর্শক রকিবুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমার থানা এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে সহজে আসা-যাওয়া করা যায়। সে কারণে চুরি-ছিনতাইসহ কিছু অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। তবে আমরা সেগুলো নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঈদের পর একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।”
কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না অপরাধ
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, মোহাম্মদপুরের ভৌগোলিক অবস্থান অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন এলাকা থেকে সহজে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ থাকায় অপরাধীরা দ্রুত এসে অপরাধ করে এলাকা ত্যাগ করতে পারে। এছাড়া বিহারি জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল জেনেভা ক্যাম্পও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে আলোচনায় রয়েছে।
মোহাম্মদপুরে চলমান পদক্ষেপগুলোকে ‘উপসর্গভিত্তিক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে অপরাধের মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়। অপরাধের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।” তার মতে, “অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্তদের একটি অংশের সঙ্গে অপরাধীদের যোগসাজশ বা ভাগ-বাটোয়ারার সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। ফলে রাজনৈতিক মহল, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের কাছ থেকে অপরাধীরা আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে, যা অপরাধ দমনে বড় অন্তরায়।”
ড. তৌহিদুল হক বলেন, “জেনেভা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে একটি অপরাধ চক্র গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত, কর্মহীন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া তরুণ রয়েছে। জীবিকার অভাবে তাদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।” তিনি ঝুঁকিপূর্ণ কিশোর ও তরুণদের শনাক্ত করে তাদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও পুনর্বাসনভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান। তার ভাষায়, “মানুষকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে তাদের একটি অংশ অপরাধকে জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিতেই থাকবে।”
আইনের দুর্বলতাও বড় কারণ
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা করলেও অভিযুক্তরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসছে। এর পেছনে তদন্ত, অভিযোগপত্র প্রস্তুতকরণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দুর্বলতা থাকতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “তদন্ত ও মামলা পরিচালনায় পেশাদারত্ব এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে মোহাম্মদপুরকে একটি অপরাধপ্রবণ ‘রেড জোন’ হিসেবে উল্লেখ করে ড. তৌহিদুল হক বলেন, “ধারাবাহিক ও সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযান এবং অপরাধের সামাজিক কারণ দূরীকরণের উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।”
কী বলছে পুলিশ
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মোহাম্মদপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করছি। এলাকাটিতে আমাদের বিশেষ নজরদারি রয়েছে। থানা পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ এবং র্যাবের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।” তিনি জানান, সম্প্রতি জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করে গ্যাং সংস্কৃতি প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “ঈদের পর একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সেটি নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, খুব দ্রুত জড়িতদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।”
মোহাম্মদপুরের অপরাধের দায় কার— এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, “আমি কারও ওপর দায় চাপাতে চাই না। তবে এলাকাটি তুলনামূলকভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসস্থল। কম খরচে বসবাসের সুযোগ থাকায় অপরাধীরাও এখানে বেশি অবস্থান করে। এলাকার শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিকরা সামাজিকভাবে এগিয়ে এলে অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসী সমস্যা রাতারাতি সমাধানযোগ্য নয়। সেখানে মাদক ও জুয়ার প্রভাব বেশি। অপরাধীদের গ্রেফতার করা হলেও বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিক ও কার্যকর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করা হবে।
সব মিলিয়ে, মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা সমস্যার সমন্বিত প্রতিফলন। ফলে কেবল অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে।



