গাজীপুরে একের পর এক খুন, গণপিটুনি ও সহিংস ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বেড়েই চলেছে। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালালেও সহিংস ঘটনা ও প্রাণহানি থামছে না। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, অপরাধ ঘটার পরই পুলিশ সক্রিয় হয়, কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধে কোনো দৃশ্যমান প্রচেষ্টা নেই।
জানুয়ারি-মে মাসে ১৬ খুন
স্থানীয়দের মতে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ১৬ মে পর্যন্ত গাজীপুরে অন্তত ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে বলে মানতে নারাজ। অন্যদিকে, বাসিন্দারা বলছেন, বারবার খুনের ঘটনায় জেলার পরিবারগুলোর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। অনেকে পুলিশের বক্তব্যকে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন' বলে সমালোচনা করেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রতিটি ঘটনার দায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
খুনের ঘটনার বিবরণ
- ১৫ জানুয়ারি: স্রীপুরের শৈলাট গ্রামে পাটকল শ্রমিক বিল্লাল হোসেনকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা।
- ১ ফেব্রুয়ারি: জয়দেবপুরে মাদ্রাসাছাত্র আব্দুর রহিমকে বড় ভাই আলামিন হোসেন হত্যা।
- ৪ মার্চ: গাজীপুর সিটির পূর্ব ধীরাশ্রম এলাকা থেকে সুজনের সহ-সভাপতি কামরুজ্জামান মোল্লার মরদেহ উদ্ধার।
- ৫ মার্চ: কালীগঞ্জে ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিকদের মধ্যে সংঘর্ষে হাবিবুর রহমান হাবি সিকদার নিহত।
- ১৪ মার্চ: স্রীপুর পৌরসভার পুকুর থেকে অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার।
- ৭ এপ্রিল: গাজীপুর সদরের পিরুজালি এলাকায় জামাইয়ের হাতে শ্বাসরোধে আসমা আক্তার নিহত।
- ১১ এপ্রিল: স্রীপুর পৌরসভার বাসা থেকে ঝর্ণা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার।
- ২৬ এপ্রিল: টঙ্গী ইস্ট থানা এলাকা থেকে সোহেল রানা ও তার ছেলে সাকিবুর রহমানের মরদেহ উদ্ধার। একই দিনে গাজীপুর সিটিতে কুলসুম বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার।
- ৩ মে: কোনাবাড়ী থানা পুলিশ গাজীপুর সিটি থেকে পোশাক শ্রমিক মমতাজ খাতুনের মরদেহ উদ্ধার।
- ৯ মে: কাপাসিয়ায় এক নারী ও তার তিন মেয়েসহ পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার। একই দিনে স্রীপুরে বিএনপি নেতা জয়নাল মোকামি গণপিটুনিতে নিহত।
- ১০ মে: কালিয়াকৈরে গরু চোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা। কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার।
- ১১ মে: গাজীপুর সিটির গাছা এলাকা থেকে অটোরিকশাচালক শুভর গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার।
- ১৪ মে: স্রীপুরের বন এলাকা থেকে অটোরিকশাচালক আসিফ হোসেনের গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার।
পুলিশি ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষোভ
স্থানীয়রা বলছেন, অকার্যকর পুলিশি ব্যবস্থার কারণে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। কালিয়াকৈরের বাগচালা গ্রামের বাসিন্দা আবুবকর সিদ্দিক বলেন, 'পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় গ্রামবাসী নিজেরাই রাতের পাহারা দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সঠিকভাবে কাজ করলে মানুষ গণপিটুনিতে যেত না।' আরেক বাসিন্দা আব্দুল জব্বার বলেন, দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার হলে অনেক ঘটনা এড়ানো যেত। ওয়ার্ড সদস্য মফিজ উদ্দিন মোল্লা বলেন, মানুষ ক্রমেই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে এবং সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে।
পুলিশের বক্তব্য
কালিয়াকৈর থানার ফুলবাড়িয়া ক্যাম্পের ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকটের কারণে সব এলাকায় নিয়মিত টহল দেওয়া সম্ভব নয়, তবে সম্প্রতি টহল জোরদার করা হয়েছে। গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) খন্দকার আশফাক উজ্জামান বলেন, ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঘটেছে। 'কাপাসিয়ার ঘটনা পারিবারিক, কালিয়াকৈরের ঘটনা ডাকাতির অভিযোগ ও জনরোষ। আমরা সব মামলা তদন্ত করছি এবং আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছি।' তিনি বলেন, মাদক ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। গাজীপুরের পুলিশ সুপার শরীফ উদ্দিন বলেন, পুলিশ সক্রিয়ভাবে তদন্ত করছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে।



