তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্র ও সমাজের আয়না; এই আয়না নিখুঁত না হলে সমাজে রাষ্ট্র সম্পর্কে ভুল প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। শুক্রবার ল রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ) এর রজতজয়ন্তী ও বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব ও স্বচ্ছতা
তথ্যমন্ত্রী বলেন, সংবাদমাধ্যম যত বেশি নিখুঁতভাবে দায়িত্ব পালন করবে, নাগরিকেরা রাষ্ট্র ও সমাজের চলমান প্রক্রিয়া সম্পর্কে তত স্বচ্ছ ধারণা পাবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বোঝার জন্য ল রিপোর্টারদের পেশাগত দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কোনো শক্তিশালী সরকারপ্রধানকে যখন আদালতের সামনে হাজির হতে হয়, তখন সাংবাদিকদের দায়িত্ব হয় সেই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা।
ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জ
বর্তমান সময়ের ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জহির উদ্দিন বলেন, অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশের ফলে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি নতুন ধরনের জটিলতাও তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতার আলোচনায়ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। এআই ব্যবহার করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যেকোনো দৃশ্য বিকৃত করা, কোনো ব্যক্তির চেহারা পরিবর্তন করা কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা এখন সম্ভব। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাংবাদিকদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা ও আইনের শাসন
অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন। জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, '১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও শহীদদের হত্যাকারীদের পক্ষেও একধরনের সাংবাদিকতা ছিল। গণমাধ্যমকে কোন মত প্রচার করবে বা কোন চিন্তার পক্ষে বয়ান তৈরি করবে, সে বিষয়ে সবার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং কোনো বিশেষ পক্ষের হয়ে বয়ান তৈরি করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আমরা গণমাধ্যমের সবকিছুই বস্তুনিষ্ঠতার মানদণ্ডে বিচার করব।'
জহির উদ্দিন আরও বলেন, 'কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার পক্ষে যাঁরা বয়ান তৈরি করেন, জনগণ সেটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা জনগণের বিষয়। কেউ আইন লঙ্ঘন করলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আমরা পুরো বিষয়টিকে আইনের মানদণ্ডে দেখার চেষ্টা করছি।'
ফেক নিউজ ও সাইবার সুরক্ষা আইন
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বর্তমানে এআই ব্যবহার করে ছড়ানো 'ফেক নিউজ' মোকাবিলায় প্রচলিত আইনগুলো যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং ডিজিটাল এভিডেন্স বা ডিজিটাল সাক্ষ্যকে বিচারব্যবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করার জন্য সর্বজনীন আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান।
আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের আদালতে অবাধ প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আদালতের লাইভ সম্প্রচার চললেও সাংবাদিকদের এজলাসে ঢুকতে না দেওয়াটা কোনোভাবেই সঠিক কাজ নয়। আমি বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল ও মাননীয় মন্ত্রীকে অনুরোধ করব, যাতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদলে আমাদের এখানেও “লাইভ ল” ব্যবস্থার অনুমোদন দেওয়া হয়।'
এলআরএফের সভাপতি হাসান জাবেদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মিশনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, আইনবিষয়ক সম্পাদক বদরুদ্দোজা বাদল, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মোহাম্মদ আলী প্রমুখ।



