পুলিশের গুলিতে ইমাম হাসান তাইমের মৃত্যু: বাবার জবানবন্দিতে মর্মান্তিক বিবরণ
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পুলিশ গুলি করার সময় এক বন্ধু ইমাম হাসান তাইমকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই মর্মান্তিক দৃশ্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলায় শহীদ ইমাম হাসান তাইমকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে বুধবার জবানবন্দি দিয়েছেন তাঁর বাবা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জবানবন্দি দেওয়ার সময় ছেলের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া জবানবন্দিতে বলেন, 'আমার ছেলে (ইমাম হাসান তাইম) দৌড় দিলে ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন পিস্তল দিয়ে গুলি করে এবং এসআই সাজ্জাদ গুলি করে। আমার ছেলে মা মা করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার বন্ধু রাহাত তাইমকে পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখনই ইন্সপেক্টর জাকির খুব কাছ থেকে অনেকবার গুলি করে। আমার ছেলে মা মা করে কাঁদতে থাকে।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। সে সময় তাইম ও তার বন্ধু শাহরিয়ার, রাহাত যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফুটওভার ব্রিজ এলাকায় লিটনের চায়ের দোকানের সামনে আন্দোলনের জন্য অবস্থান করছিল।
প্রায় ২০-২৫ জন পুলিশ তাঁর ছেলে ও তার বন্ধুদের চতুর্দিক দিয়ে ধাওয়া করে। কোনো দিকে যেতে না পেরে তাঁর ছেলে ও তার বন্ধুরা লিটনের চায়ের দোকানে প্রবেশ করে এবং দোকানের শাটার টেনে নিচে নামায়। পুলিশ সদস্যরা দোকানের শাটার খুলে তাঁর ছেলে ও তার বন্ধুদের বের করে লাঠি, রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারধর শুরু করে। পরে পুলিশ সদস্যরা দৌড় দিয়ে চলে যেতে বলে, কিন্তু দৌড় দেওয়ার সময় গুলিবর্ষণ করা হয়।
মৃত্যুর পরের ঘটনা ও লাশ পরীক্ষা
খবর পেয়ে সেদিন বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান ময়নাল হোসেন। হাসপাতালের নতুন বিল্ডিংয়ের ইমার্জেন্সি মর্গে প্রবেশ করে তিনি তাঁর ছেলের লাশ পড়ে থাকতে দেখতে পান। ছেলের লাশের ওপরের দিকে, বুকে, পেটে এবং পায়ে অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখতে পান তিনি। তখন তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, 'একটা মানুষ মারতে কয়টি গুলি লাগে?' পরে ছেলের লাশ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে গোসল করানো হয়। গোসলের সময় ছেলের লাশের কোমরের বাঁ পাশে বড় একটি গর্তের দাগ দেখা যায়, যা পিস্তলের গুলির দাগ বলে ধারণা করা হয়।
মামলার আসামিদের তালিকা
এই মামলায় মোট ১১ জন আসামি রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯ জন পলাতক। তাঁরা হলেন:
- ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান
- সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী
- ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন
- ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান
- ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শামীম
- সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস
- সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসাইন
- সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. ওহিদুল হক
- সাবেক এসআই সাজ্জাদ উজ জামান
কারাগারে থাকা দুই আসামি হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী। বুধবার তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এই মামলাটি মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার দাবি জানাচ্ছে।



