গুমবিরোধী আইন প্রণয়নে আশা ও প্রশ্ন: আইনমন্ত্রীর ঘোষণা নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের প্রতিক্রিয়া
জাতীয় সংসদে মাননীয় আইনমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত গুম ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো আরও যাচাই-বাছাই করা হবে এবং আপাতত সংসদে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। এ বিষয় দুটিতে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং শিগগিরই সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে।
আশা ও প্রশ্নের দ্বৈততা
মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমরা দীর্ঘদিন ধরে গুমবিরোধী একটি আইনের প্রত্যাশা করে আসছি। এটি কেবল একটি নীতিগত দাবি নয়, বরং একটি গভীর মানবিক প্রয়োজন। কারণ এ দেশে বহু মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন। অনেকেই আর ফিরে আসেননি, অনেকেই ফিরে এসেছেন চরম মানসিক ও শারীরিক ক্ষত নিয়ে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—এই ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর কোনও আইনগত প্রতিকার এতদিন ছিল না।
গুম নিছক একটি অপরাধ নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত এক ভয়াবহ লঙ্ঘন। একজন ব্যক্তিকে অদৃশ্য করে দেওয়ার মধ্যে যে নিষ্ঠুরতা নিহিত, তা কেবল একটি জীবনের অবসান ঘটায় না, বরং একটি পরিবারের স্বাভাবিক অস্তিত্বকেও ভেঙে দেয়। এই নির্মম বাস্তবতা আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, যা রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেও ক্ষুণ্ন করেছে।
আইনমন্ত্রীর ভূমিকা ও প্রত্যাশা
এই প্রেক্ষাপটে আইনমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিচয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একজন আইনজীবী হিসেবে তার অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, বিশেষ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর মতো মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানে তার ভূমিকা—এসবই একটি ইতিবাচক প্রত্যাশার ভিত্তি তৈরি করে। আমরা এও জানি, এই প্রতিষ্ঠানের হয়ে তিনি অসংখ্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করেছেন এবং মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রত্যাশা জাগে, রাষ্ট্রের দায়িত্বে থেকেও তিনি মানবাধিকারবান্ধব আইন প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন। তবে অতীতের সরকারগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্কও করে। দেশে মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান আইনগত কাঠামো, বিশেষ করে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ তার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত কার্যকারিতা অর্জন করতে পারেনি।
কার্যকর আইনের প্রয়োজনীয়তা
তদন্ত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সুপারিশ বাস্তবায়নে বাধ্যতামূলক কাঠামোর অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘাটতি—এসব কারণে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক, যা প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঘটনাগুলোতেও কমিশনের দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ খুব কমই দেখা গেছে।
এই বাস্তবতায় গুমবিরোধী একটি পৃথক ও শক্তিশালী আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। এটি শুধু একটি আইন প্রণয়নের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার একটি সুযোগ। এমন একটি আইন প্রয়োজন, যা কেবল অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করবে না বরং প্রতিরোধ, প্রতিকার এবং জবাবদিহিতার একটি কার্যকর কাঠামোও গড়ে তুলবে।
যাচাই-বাছাই ও সময়ের গুরুত্ব
আইনমন্ত্রী যে যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলেছেন, তা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। একটি সুসংহত ও কার্যকর আইন প্রণয়নের জন্য পর্যালোচনা অপরিহার্য। তবে একইসঙ্গে এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি, বিলম্ব যেন ন্যায়বিচারের পথে আরেকটি অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়। গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্য সময়ের প্রতিটি ক্ষণই দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রতীক।
একটি কার্যকর গুমবিরোধী আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে মনে হয়:
- গুমকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা
- তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা গঠন
- ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা
- দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য কার্যকর ও সময়োপযোগী বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়। এই মুহূর্তে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—গুমবিরোধী আইন প্রণয়ন আর বিলম্বের বিষয় নয়, এটি এখন সময়ের দাবি। এই দাবির পেছনে রয়েছে অসংখ্য নিখোঁজ মানুষের পরিবারের কান্না, অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষা।
আস্থা ও সচেতনতা
আইনমন্ত্রীর প্রতি আমাদের আস্থার জায়গাটি শুধুমাত্র বর্তমান দায়িত্বের কারণে নয়, বরং অতীতের কাজ ও অবস্থানের কারণেও। একজন মানবাধিকারকর্মী যখন রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের দায়িত্বে থাকেন, তখন তার কাছ থেকে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক।
তবে এই আস্থা নিঃশর্ত নয়—এটি প্রত্যাশানির্ভর। আমরা আশাবাদী, কিন্তু একইসঙ্গে সচেতনও। আমরা এই প্রক্রিয়ার দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখতে চাই। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গঠনমূলক মতামত প্রদান করবো, কারণ এটি কেবল একটি আইনের প্রশ্ন নয়—এটি একটি সমাজের নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণের প্রশ্ন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যারা জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবারের বেদনা ও আহাজারি আমাদের নীরব থাকতে দেয় না। সেই কণ্ঠস্বরই আমাদের এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে বাধ্য করে—যেন একটি কার্যকর, মানবাধিকারসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য গুমবিরোধী আইন দ্রুত প্রণীত হয়। এই প্রত্যাশা পূরণ হবে—এমন বিশ্বাসই সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী



