মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনা মৃদুল রাণী: অর্ধশতাব্দী পরও অন্ধকারে একটি জীবন
ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার বাউরপাথর গ্রাম। ভারত সীমান্তের কাছাকাছি এই গ্রামের বাসিন্দা দাড়িকানাথ চৌধুরীর কন্যা মৃদুল রাণী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন এক তরুণী কিশোরী। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্নার কাজে সহায়তা করতেন। কিন্তু ১৪ আগস্ট একটি মর্মান্তিক ঘটনা তার জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: একটি মাইন বিস্ফোরণের গল্প
সেদিন সকালে মৃদুল রাণী বিলোনিয়ার আমজাদনগরে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটিতে যাচ্ছিলেন। পথে পাকিস্তানি বাহিনীর পুঁতে রাখা একটি মাইনের ওপর তার পা পড়ে। ভয়াবহ বিস্ফোরণে তার ডান পায়ের দুই-তৃতীয়াংশ কোমর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তীব্র যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণের মধ্যে তাকে ভারতের বিলোনিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসার পর তিনি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন।
মৃদুল রাণী স্মৃতিচারণ করে বলেন, "মুক্তিযুদ্ধে পা হারানোর পর কেউ বিয়ে করতে চায়নি। ৪১ বছর পর আমার বিয়ে হয়। অনেকের কাছে সহযোগিতা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য গিয়েছি, কেউই সহযোগিতা করেনি। কত মানুষ কত কথা বলেছে, কিন্তু কেউ কথা রাখেনি।"
স্বাধীনতার ৫৫ বছর: পরিবর্তনহীন ভাগ্যের গল্প
স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মৃদুল রাণীর ভাগ্যের কোনো উন্নতি হয়নি। তিনি জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা সহায়তার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু আজও তিনি কোনো সাড়া পাননি।
তার পারিবারিক অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। স্বামী আনন্দ রায় শারীরিকভাবে অসুস্থ। বাড়ির পাশে একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে সামান্য আয়ে কোনোমতে সংসার চলে। দুই ছেলের মধ্যে একজন ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়েছেন এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। অপর ছেলে অনিক রায় (২৪) বাবাকে কাজে সহায়তা করে পরিবারের পাশে রয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পথে বাধা: প্রমাণের অভাব
ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবু নাছের চৌধুরী এই বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, মৃদুল রাণীর বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য কিছু প্রামাণ্য নথি বা কাগজপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবু নাছের চৌধুরী বলেন, "মৃদুল রাণীর আহত হওয়ার সময়কার কোনো চিকিৎসা সনদ, হাসপাতালের কাগজপত্র বা সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদি যদি সংরক্ষিত থেকে থাকে, তাহলে তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হতে পারে।"
এই প্রমাণের অভাবই মূলত তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অনেক দলিল-দস্তাবেজ নষ্ট হয়ে গেছে বা সংরক্ষিত নেই।
একটি অনুরোধ: মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান
মৃদুল রাণীর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি অসংখ্য ব্যক্তির জীবন, ত্যাগ ও সংগ্রামের গল্প। যুদ্ধাহত এই বীরাঙ্গনার দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও সংগ্রাম আমাদের সমাজের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও সম্মান কতটুকু?
ফেনীর সেই প্রত্যন্ত গ্রামে আজও মৃদুল রাণী অপেক্ষায় রয়েছেন। হয়তো একদিন তার ত্যাগের স্বীকৃতি মিলবে। হয়তো একদিন রাষ্ট্র তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবে। কিন্তু সেই দিনের জন্য তাকে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, তা কেউ জানে না।



