নিরাপদ পানি অধিকার: উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী রায় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উচ্চ আদালতের একটি দ্বৈত বেঞ্চ সুয়োমোটো রুল নং ০৯/২০২০-এ এক যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন, যেখানে নিরাপদ ও পানযোগ্য পানির নিশ্চয়তাকে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের আওতায় ‘জীবন ধারণের অধিকার’-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পানি ও স্যানিটেশন সেবাকে সরকারের করুণা বা সমাজকল্যাণমূলক কাজ থেকে সরিয়ে একটি ‘প্রয়োগযোগ্য সাংবিধানিক গ্যারান্টি’তে উন্নীত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো ও পানির অধিকার
নিরাপদ পানির অধিকার কেবল বাংলাদেশের সংবিধানে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বৈশ্বিক মানবাধিকার কাঠামোর একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। ১৯৪৮ সালের ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র’-এর ২৫ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক ব্যক্তির পর্যাপ্ত জীবনযাত্রার মানের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যেখানে সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ অন্তর্ভুক্ত। যদিও সরাসরি পানির উল্লেখ নেই, আধুনিক ব্যাখ্যায় এটি স্পষ্ট যে পানি ছাড়া জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা অসম্ভব।
২০১০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ তার ৬৪/২৯২ প্রস্তাবের মাধ্যমে নিরাপদ ও পরিষ্কার পানীয় জল এবং স্যানিটেশনকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জীবনের পূর্ণ উপভোগ এবং অন্যান্য সকল মানবাধিকার বাস্তবায়নের জন্য পানির অধিকার অপরিহার্য। এছাড়া ‘অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ’-এর ১১ ও ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের পাশাপাশি ‘সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের’ নিশ্চয়তা দিতে বাধ্য, যার প্রাথমিক শর্ত হলো নিরাপদ পানি।
জেন্ডার ও পানির অধিকার: আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা
পানির সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে নারীর ওপর। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ বা সিডও-এর ১৪ অনুচ্ছেদে বিশেষভাবে গ্রামীণ নারীদের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপক্ষকে গ্রামীণ নারীদের পর্যাপ্ত জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করার জন্য স্যানিটেশন ও পানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়ার সরাসরি তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সিডাও-এর এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ পানি সংগ্রহের ভার ঐতিহাসিকভাবেই নারীর ওপর ন্যস্ত। যখন পানি সংগ্রহ করতে নারীকে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়, তখন তা কেবল তার শ্রমের অপচয় নয়, বরং সিডাও-এর ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে একটি কাঠামোগত বাধা। এছাড়া, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৬-এর লক্ষ্য হলো— ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, যা এসডিজি ৫ (জেন্ডার সমতা)-এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অধিকার যখন মর্যাদার প্রশ্ন
বাংলাদেশে পানি ও স্যানিটেশনকে দীর্ঘদিন কেবল প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকারের মানদণ্ডে এটি মর্যাদার প্রশ্ন। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য লবণাক্ত পানি পান করা কেবল কষ্টের বিষয় নয়, এটি তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে। উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, “জীবন মানে কেবল জৈবিকভাবে বেঁচে থাকা নয়, বরং মানবিক মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকা”।
এই মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় যখন স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে নারীরা সন্ধ্যার অন্ধকারের অপেক্ষা করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক নারী শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার শিকার হন। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ‘নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত অখণ্ডতার’ পরিপন্থী।
নীতিনির্ধারণীতে রূপান্তর ও নতুন চ্যালেঞ্জ
ইতোমধ্যেই হালনাগাদ প্রক্রিয়াধীন ‘দুর্গম এলাকার জাতীয় ওয়াশ কৌশলপত্র’ এবং ‘জাতীয় পানি সরবরাহ নীতিমালা’ নিঃসন্দেহে আশার আলো দেখাচ্ছে। এখানে ‘বেসিক সার্ভিস’ থেকে বেরিয়ে ‘সেফলি ম্যানেজড’ বা নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত সেবার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, পানি কেবল টিউবওয়েলে থাকলেই হবে না, তা হতে হবে দূষণমুক্ত এবং প্রাঙ্গণের ভেতরে সহজলভ্য।
পানির এই সহজলভ্যতা নারীর ‘বিনাশ্রম গৃহকর্ম’ কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। বর্তমানের প্রচলিত সামাজিক প্রথায় নারীরা যে সময় ও শ্রম ব্যয় করেন, পানি বাড়ির আঙিনায় পাওয়া গেলে সেই সময় তারা শিক্ষা বা উপার্জনে ব্যয় করতে পারবেন, যা সিডাও সনদের মূল চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ: সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অধিকার
মানবাধিকারের এই লড়াইয়ে নারীর ভূমিকা কেবল সুবিধাভোগী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আইসিইএসসিআর-এর সাধারণ মন্তব্য ১৫ অনুযায়ী, পানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশে এখনও পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষের আধিপত্য (৭৫ শতাংশ) বজায় রয়েছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব পানি দিবসে আমাদের দাবি হওয়া উচিত— ওয়াশ কমিটিগুলোতে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ। যখন প্রতিটি ঘরে নিরাপদ পানির ধারা পৌঁছাবে এবং সেই পানির ব্যবস্থাপনায় নারী, প্রান্তিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সমান অংশীদারত্ব থাকবে, তখনই প্রকৃত অর্থে ‘সাম্যের হাসি’ ফুটে উঠবে।
শেষ নয়, নতুন করে শুরু
নিরাপদ পানি সরবরাহ এখন আর নির্বাচনের আগে দেওয়া কোনও ‘দাতব্য প্রতিশ্রুতি’ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকদের কাছে একটি ‘অমোচনীয় ঋণ’। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকারকে এই অধিকার বাস্তবায়নের অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এটি আমাদের সু শাসনের পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক দলিলগুলো এবং আমাদের সংবিধানের মেলবন্ধনে যে নতুন আইনি পথ তৈরি হয়েছে, তাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। ২০২৬ সালের বিশ্ব পানি দিবসে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত— পানির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে পানির অধিকারের পথে হাঁটা। আমাদের প্রতিটি পানির উৎস যেন হয় সমতা, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের একেকটি প্রতীক।



