মনজুর আলমকে টানতে ব্যর্থ এনসিপি: যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে সরে পড়লেন সাবেক মেয়র
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমকে শেষ পর্যন্ত দলে টানতে পারেনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তাকে নগর শাখার আহ্বায়ক এবং পরবর্তীতে সিটি মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে তিনি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।
হাসনাত আবদুল্লাহর প্রস্তাব ও অনুষ্ঠানের আয়োজন
এর আগে চট্টগ্রামে মনজুরের বাসভবনে গিয়ে তাকে এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। এর ওপর ভিত্তি করেই বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এনসিপি। তবে শেষ পর্যন্ত মনজুরকে ছাড়াই অনুষ্ঠান শেষ করতে হয়েছে দলটিকে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও অবস্থান গোপন
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনুষ্ঠানের আগে এনসিপির পক্ষ থেকে মনজুর আলমের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি বিরক্ত হয়ে দুইদিন ধরে যোগাযোগ বন্ধ রাখেন। প্রথমে নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন এবং একপর্যায়ে উত্তর কাট্টলীর বাসা থেকেও সরে যান। পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন বাসায় গিয়েও তাকে খুঁজে পায়নি এবং তার অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি।
অনুষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য নেতার অনুপস্থিতি
শুধু মনজুর আলমই নন; বিএনপি-জামায়াত বা অন্য কোনো দলের উল্লেখযোগ্য কোনো নেতাকে যোগ দিতে দেখা যায়নি। কিছু লোককে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হলেও তারা পরিচিত মুখ ছিলেন না। ফলে অনুষ্ঠানটি ছিল একেবারে সাদামাটা এবং হতাশাজনক। অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
পরিবারের সদস্যের বক্তব্য
শুক্রবার বিকালেও মনজুর আলমের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তার পরিবারের এক সদস্য জানান, ‘মনজুর আলম এনসিপির বিরক্তিতে ফোন বন্ধ রেখেছেন এবং বাসা থেকেও সরেছিলেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কাউকে কোনো দলে ভেড়ানো সম্ভব নয়।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘একটি পক্ষ তাকে এনসিপিতে ঠেলে দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়।’
এনসিপির অবস্থান
এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর সমন্বয়কারী ও মিডিয়া সেলের প্রধান রিদুয়ান হৃদয় বলেন, ‘মনজুর আলমের যোগদানের কোনো খবর আমার জানা নেই এবং যোগদান না করায় আমরা হতাশ নই।’ তিনি জানান, অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার আত্মীয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মালেকা আফরোজ এবং লাভ বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী যোগ দিয়েছেন। তাই অনুষ্ঠান সফল হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশ ও গোয়েন্দাদের তৎপরতা
সূত্র জানায়, অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে থেকে মনজুরের সঙ্গে এনসিপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোন বন্ধ করলে তার আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এমনকি অনুষ্ঠানের একদিন আগে পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাকে হন্যে হয়ে বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজেন। মূলত মনজুরকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত করে দলে যোগ দেওয়ানোর জন্যই এসব তৎপরতা ছিল।
হাসনাতের সফর ও বিএনপির প্রতিক্রিয়া
বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন মনজুরের বাসায় গিয়ে হাসনাত তাকে এনসিপির নগর কমিটির আহ্বায়ক এবং সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়নের প্রস্তাব দেন। কিন্তু মনজুর রাজি হননি। হাসনাত দাবি করেছিলেন এটি ব্যক্তিগত সফর এবং কোনো রাজনৈতিক আলোচনা হয়নি। তবে এখন স্পষ্ট যে সফরটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। ওই সময় হাসনাত বিএনপি নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন এবং ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ ও ‘ফ্যাসিস্টের পৃষ্ঠপোষক’ মনজুরের বাসায় গিয়ে ‘জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি’ করার অভিযোগ ওঠে। পরে বিএনপির অপর পক্ষ তাকে উদ্ধার করে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয়। চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনও এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বলেন, ‘সংসদে বড় বড় কথা বললেও হাসনাতরা ফ্যাসিস্টদেরই পৃষ্ঠপোষকতা করছেন।’
মনজুর আলমের রাজনৈতিক পটভূমি
চসিকের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগের এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর শিষ্য ছিলেন মনজুর আলম। উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড থেকে তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন এবং বহুবার প্যানেল মেয়র ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রায় দুই বছর ভারপ্রাপ্ত মেয়র ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনে মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রেফতার হওয়ার পর তার পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলে বিএনপি সুযোগ নেয়। ২০১০ সালে বিএনপির দুঃসময়ে প্রার্থী সংকটে মনজুরকে বেছে নেওয়া হয় এবং তিনি বিএনপির মনোনয়নে তার গুরু মহিউদ্দিনকে বিপুল ভোটে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। পরে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনে হেরে যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি এনসিপির ইফতার মাহফিলসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সীতাকুণ্ডে বিএনপি প্রার্থী লায়ন আসলাম চৌধুরীসহ বিএনপির বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে সরব ছিলেন। ক্ষমতা বা পদে না থাকলেও তিনি সব সময় আলোচনায় ছিলেন এবং চট্টগ্রামের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হিসেবে বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সমাজসেবায় যুক্ত রয়েছেন।



