২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী দীর্ঘ অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার প্রক্রিয়ার পর এই সংসদ গঠিত হওয়ায় জনগণের প্রত্যাশা ছিল— একটি বৈষম্যহীন ও মানবাধিকারবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা।
সংসদীয় বিতর্কের নতুন মাত্রা
২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিতর্কগুলো বিগত দেড় দশকের একতরফা রাজনীতির বিপরীতে অত্যন্ত প্রাণবন্ত, তর্কমূলক এবং বহুমুখী রূপ ধারণ করেছে। একদিকে সরকারপক্ষ (বিএনপি) স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে, অপরদিকে বিরোধী দলগুলো (জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও অন্যান্য) ‘জুলাই বিপ্লবের’ পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বাস্তবায়নে আপসহীন ভূমিকা পালন করছে।
২০২৬ সালের সংসদের বিতর্কগুলো এখন আর কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত ‘পুরোনো ধারার রাজনীতি’ বনাম ‘বিপ্লবোত্তর নতুন ধারার আকাঙ্ক্ষ’র একটি লড়াই। সংসদে সরকারি দল সংখ্যাতত্ত্বে শক্তিশালী হলেও, যুক্তির লড়াইয়ে বিরোধী দলগুলো তাদের নিয়মিত চাপের মুখে রাখছে। সংসদীয় এই অধিবেশনটি মূলত রাষ্ট্র সংস্কারের আইনি রূপরেখা এবং নির্বাচনের পর উদ্ভূত নতুন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে।
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন ও বিতর্ক
সব বিবেচনায়, সংসদের প্রথম অধিবেশনটি ছিল অত্যন্ত কর্মমুখর। ১২ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে বিল হিসেবে পেশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান সমালোচনার বিষয়গুলো হলো— ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটিতে সরকারি দলের একচ্ছত্র আধিপত্য (১০ জন), পর্যালোচনায় তাড়াহুড়ো এবং স্বচ্ছতার অভাব।
বিশেষ করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ ও ‘টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ’ এর মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আইনের দ্বৈততা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, গণশুনানি বা বিশেষজ্ঞদের মতামত ছাড়া রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্বের নামে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কিনা।
এমন বাস্তবতায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত ভিত্তি হয়তো তৈরি করেছে। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা— যেমন বাউল সাধকদের ওপর হামলা, ভাস্কর্য ভাঙচুর, সাংবাদিকদের হয়রানি এবং রোহিঙ্গ্যা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার কর্মীদের ওপর নজরদারি— প্রমাণ করে যে, কেবল আইন পাস করাই যথেষ্ট নয়। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে এসব অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত কতটুকু করা গিয়েছে, সেই প্রশ্ন নাগরিকদের এখনও রয়েছে।
ভাষা ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক
জাতীয় সংসদ মঞ্চের প্রথম অধিবেশন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার আলাপে কতটুকু সফলতার সাথে ৫০ দিনের (বিরতিহীন) প্রথম অধিবেশন শেষ করতে পেরেছে, সেই আলাপ-আলোচনায় যাবার আগে দুটি বিষয় নাগরিকদের-প্রেক্ষাপটে সংসদের মাননীয় সদস্য ও স্পিকারদের মনে করিয়ে দিতে চাই।
প্রথমত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এবং সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষার ব্যবহার কেবল রীতি নয়, বরং একটি আইনি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সমস্যা এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও সংবিধান ও ১৯৮৭ সালের আইন অনুযায়ী বাংলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক, তবুও পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে যেমন- ত্রয়োদশ সংসদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা সুরক্ষা এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির মতো জটিল বিষয়ে অনেকগুলো আইন পাস হয়েছে। এই প্রযুক্তিগুলোর যুৎসই বাংলা পরিভাষা না থাকায় বিলগুলো প্রণয়নের সময় আইনি শব্দচয়ন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, ইংরেজি শব্দের অত্যধিক ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে আইনগুলো দুর্বোধ্য হয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের স্পিকারকে দেখা যাচ্ছে অনেকটা রেফারির ভূমিকায়। যেহেতু কৌতুকের সীমা বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে, তাই সংসদের রেকর্ডকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে এবং জনসমক্ষে ভুল বার্তা যাওয়া রোধ করতে স্পিকারকে রেকর্ড থেকে ওইসব অশালীন বা ব্যক্তিগত অংশগুলো মুছে (এক্সপাঞ্জ) ফেলতে হচ্ছে। সংসদীয় কৌতুক বা ‘পার্লামেন্টারি উইট’ হওয়ার কথা ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক, যা যুক্তির খামতি ধরিয়ে দেবে। কিন্তু বর্তমানে এটি অনেকটা ‘পার্সোনাল ট্রলিং’-এ পরিণত হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সংসদীয় সংস্কৃতির জন্য একটি নেতিবাচক উদাহরণ তৈরি করছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কোনও কোনও বিতর্কে দেখা গেছে, সদস্যের কথা বলার ধরন বা শারীরিক ভঙ্গি নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করা হচ্ছে বা মাইক্রোফোনে সূক্ষ্ম বিদ্রূপ করা হচ্ছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক টানে কথা বলা সদস্যদের নিয়ে শহরের উচ্চশিক্ষিত সদস্যদের ‘অভিজাত হিউমার’ ব্যক্তিগত ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বুদ্ধিবৃত্তিক ‘উইট’ -এর পরিবর্তে অনেকটা গ্রামীণ সালিশি বৈঠকের তর্কের মতো রূপ নিচ্ছে।
উর্দু ভাষা ও নাগরিক অধিকার
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ভাষার ব্যবহার নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সেখানে উর্দু ভাষায় কৌতুক এবং উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার— এই দুটি বিষয় একটি বৈপরীত্য তৈরি করেছে। একদিকে সংসদে শ্লেষ বা ব্যঙ্গ প্রকাশে উর্দু বুলি ব্যবহৃত হচ্ছে, অপরদিকে এই জনগোষ্ঠীর মানবিক ও নাগরিক সমস্যাগুলো মূল আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। হাসি-তামাশার বাইরে যখন এই জনগোষ্ঠীর (যাঁরা বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত) আবাসন, কর্মসংস্থান বা জেনেভা ক্যাম্পের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সময় আসে, তখন সংসদীয় বিতর্কে এক ধরনের অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।
উর্দু ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী কি তখন সংসদ সদস্যদের বলেন, ‘তুম হামসে বেওয়াফা করো, হাম মহব্বত নাহি করেঙ্গে?’ যদি উর্দুভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বলতে পারতেন, ভালো হতো— কেননা, এটি মূলত এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ ৫৪ বছরের পুঞ্জীভূত অভিমান, বঞ্চনা এবং নাগরিকত্বের অমীমাংসিত সংকটের এক কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ।
রোহিঙ্গা সংকট ও মানবাধিকার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘ ৯ বছরের বেশি সময় ধরে চলমান এই সংকট বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অধিবেশনে উপস্থাপিত হয়। মানবাধিকার সুরক্ষার মানদণ্ডে সংসদীয় আলোচনার মূল বিষয়বস্ত তিনটি— প্রথমত, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন, সংসদ সদস্যরা একমত হয়েছেন যে, রোহিঙ্গাদের টেকসই সমাধান কেবল মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই সম্ভব। অধিবেশনে মিয়ানমারের বর্তমান জান্তা সরকার এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে নতুন প্রেক্ষাপটে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন হ্রাস, বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তার বাজেট কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার (খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অধিবেশনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এই মানবিক দায়বদ্ধতা পালনের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। সর্বশেষ, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও মানবাধিকার: ক্যাম্পগুলোতে বাড়তে থাকা অপরাধ, মাদক পাচার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় বাংলাদেশিদের মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
কিন্তু আমারা যারা অনেক বছর যাবৎ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাথে কাজ করি, তারা জানি, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ওপর যে জোর দেওয়া হয়, তা প্রকৃতপক্ষে তাদের নাগরিক অধিকার ও আইনি কর্মসংস্থান অস্বীকার করার একটি সূক্ষ্ম প্রশাসনিক কৌশল। এখানে প্রত্যাবাসনকে একটি ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট হরাইজন’ বা এমন এক অলীক গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা সর্বদা দৃষ্টিসীমায় থাকলেও বাস্তবে কখনোই পৌঁছানো সম্ভব হয় না; এই ‘স্থায়ী অস্থায়ীত্বের’ (পারমানেন্ট টেমপোরারিনেস) মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্থানীয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত না করে কেবল আন্তর্জাতিক ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল রাখা হয়। প্রত্যাবাসনের এই ধারণাটি, ঢাকাকে রোহিঙ্গাদের একীভূতকরণ বা দীর্ঘমেয়াদী অধিকার প্রদানের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়, যেখানে ক্যাম্পগুলোতে স্থায়ী আবাসন নির্মাণে বাধা দিয়ে কৃত্রিমভাবে একটি অস্থায়ী পরিবেশ বজায় রাখা হয়। দাফতরিকভাবে কাজ করা নিষিদ্ধ হলেও কৃষি বা নির্মাণ খাতে তাদের সস্তা ও নমনীয় শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা রাষ্ট্রকে জনকল্যাণমূলক সুবিধা প্রদানের দায় ছাড়াই সল্প মজুরিতে শ্রম ব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছে। ঐতিহাসিক জবরদস্তিমূলক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশি আকর্ষণীয়। এই অনিশ্চিত পরিবেশ বিশেষ করে নারীদের স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষার অধিকারকে সংকুচিত করছে। পরিশেষে, প্রত্যাবাসন কোনো প্রকৃত সমাধান নয়, বরং এটি একটি ‘নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি’, যার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জীবনকে নিরাপত্তা বা নাগরিকত্ব ছাড়াই কেবল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বার্থে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং বিশেষ করে ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের পরিসংখ্যান ও বিচার নিয়ে সংসদীয় বিতর্ক এক উত্তপ্ত রূপ নিয়েছে।
২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর (১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে) সারা দেশে ৪৬৪টি হত্যা মামলা এবং ৬৬৬টি ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে হত্যা মামলায় ৬০৪ জন এবং ধর্ষণ মামলায় ৫৩০ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৬৬৬টি ধর্ষণের মামলা— অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৮টির বেশি মামলা, নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি ভয়াবহ চিত্র। মানবাধিকারের ভাষায় এটি কেবল অপরাধ নয়, বরং নারীর চলাচলের স্বাধীনতা এবং শারীরিক অখণ্ডতার ওপর চরম আঘাত।
মামলার সংখ্যার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো অপরাধের ভয়াবহতা, যা প্রমাণ করে যে সামাজিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে অপরাধীরা এখনো এক ধরনের দায়মুক্তির পরিবেশ পাচ্ছে। ৬৬৬টি ধর্ষণের ঘটনায় ভিকটিমদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে সংসদে কোনও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকাটা মানবাধিকারের দিক থেকে একটি বড় ঘাটতি। ধর্ষণের শিকার নারীরা কি যথাযথ আইনি সহায়তা এবং সামাজিক মর্যাদার সুরক্ষা পাচ্ছেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশে ‘মব কালচার’ ও সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সারাদেশে মব বা গণপিটুনির ৪৯ ঘটনায় ২১ অন্তত ২১ জন নিহত ও ৪৯ জন আহত হয়েছেন। মার্চে ৩৬টি মব বা গণপিটুনির ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ৩১ জন আহত হয়েছিলেন।
২০২৬ সালের মার্চ এবং এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের আটকের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই দুই মাসে অন্তত ৫ জন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে তাদের অনলাইন পোস্টের কারণে আটক করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে অন্তত একজন পীর (কুষ্টিয়ায়) নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিতভাবে জানা গেছে। বাউলদের ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রে শারীরিক আঘাত এবং তাদের আস্তানা বা দরবার ভাঙচুরের ঘটনা একাধিক স্থানে ঘটেছে, যা এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে।
পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা, বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট এবং রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে ক্যাম্পাস ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। ভিডিও প্রমাণ থাকলেও গ্রেপ্তার না হওয়ায় অপরাধীরা দায়মুক্তি পাচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা একে বিচারিক সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেবল প্রশাসনিক তদারকি নয়, বরং পুলিশের নিরপেক্ষতা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ জরুরি।
সাংস্কৃতিক ও নাগরিক স্বাধীনতার সংকট
২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতি—শাহবাগে সমকামী সন্দেহে শারীরিক আক্রমণ, রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর ছাত্রদলের সহিংসতা, বাউলশিল্পীদের ওপর আঘাত, সাংস্কৃতিক কর্মী ইমির আটক এবং সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি— প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো এখনও সহনশীলতা ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে বহুদূরে অবস্থান করছে।
২০২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির এক জটিল ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে, যেখানে সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক চাপ বৃদ্ধির ঘটনাগুলো নাগরিক স্বাধীনতার ধারাবাহিক সংকোচনকে নির্দেশ করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মী ইমির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনের প্রয়োগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে অত্যন্ত বিতর্কিত; কারণ রাষ্ট্রবিরোধী চরমপন্থী দমনে তৈরি এই আইনের মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বী শিল্পীদের আটক করা মূলত মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে তকমা দেওয়ার একটি অপপ্রচেষ্টা, যা দীর্ঘমেয়াদী আটক ও জামিনহীনতার মাধ্যমে এক ধরণের বিচার-পূর্ব শাস্তিতে পরিণত হয়েছে। একইভাবে, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরে (ডিএফপি) চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপর হামলার ঘটনাটি সরাসরি সাংস্কৃতিক অধিকারের ওপর আঘাত এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুরতার বহিঃপ্রকাশ, যা স্বাধীন চিন্তার বহিঃপ্রকাশকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বাধাগ্রস্ত করার একটি কৌশল মাত্র। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ইকোনোমিস্ট-এর প্রতিনিধি তানবীরুল মিরাজ রিপনকে গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক তলব করা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর একটি পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ এবং মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরির নামান্তর, যা নাগরিকদের সঠিক তথ্য পাওয়ার অধিকারকে ব্যাহত করে এক ধরণের ‘চিলিং ইফেক্ট’ তৈরি করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার কর্মী ইয়েন ইয়েন-এর প্রতি রাঙামাটির জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জারি করা সতর্কবার্তা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগের এক প্রকট উদাহরণ; যেখানে কোনও সুনির্দিষ্ট অপরাধের উল্লেখ ছাড়াই কেবল গোয়েন্দা প্রতিবেদনের দোহাই দিয়ে তার স্বাধীনভাবে কাজ করার ও কথা বলার অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে।
এই চারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে যদি আমরা এক সুতোয় গাঁথি, তবে বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর তিনটি বড় প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়—
- নিশ্চয়তার অভাব ও ভীতি: আইনি বা প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে নাগরিকদের এক ধরণের ‘অনির্দিষ্ট ঝুঁকির’ মধ্যে রাখা হচ্ছে।
- গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক সমন্বয়: নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক আদেশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিকে নষ্ট করছে।
- পেশাদারত্বের ওপর আঘাত: চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী— সবাই নিজ নিজ পেশাগত জায়গা থেকে রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি তুলে ধরেন। তাদের ওপর এই বহুমুখী আক্রমণ প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে নিয়ন্ত্রণ; শাহবাগের মব জাস্টিস থেকে শুরু করে পাহাড়ের প্রশাসনিক সতর্কবার্তা— সবই মূলত নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণের একেকটি ‘প্রযুক্তি’।
২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ যেখানে বৈষম্যহীন নতুন রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেখানে ইমি, তানবীরুল মিরাজ বা ইয়েন ইয়েনদের সাথে ঘটা এই ঘটনাগুলো সেই প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক। মানবাধিকার সুরক্ষা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না, এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের রাজনৈতিক অপপ্রয়োগ বন্ধ করা, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তাদের আইনি গণ্ডির মধ্যে রাখা এবং পাহাড়ে বা সমতলে স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। যদি এই দমনমূলক নীতি পরিবর্তন না হয়, তবে নাগরিক অধিকারের পরিসর আরও সংকুচিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করে তুলবে। মানবাধিকারের প্রশ্নে ‘শূন্য সহনশীলতা’ কেবল অপরাধীর জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা জরুরি। আর ক্ষমতাসীন ক্ষমতাবানরা যদি তা বুঝতে না পারেন তবে বলতে হয়, ‘ইয়ে জবরদস্ত খামোশি জিসে তুম ওয়াক্ত কি আওয়াজ সমঝতে হো, কিসি তুফান কা পেশ খৈমা হ্যায়।’ নাজিউর রহমান মঞ্জু প্রায়ই বলেন, শায়েরি কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং এটি প্রতিবাদের একটি শক্তিশালী ভাষা। আর ইমি, তানবীরুল মিরাজ, ইয়েন ইয়েনসহ সকল সাহসী নাগরিকদের জন্য ‘মঞ্জিল উনহি কো মিলতি হ্যায় জিনকে সপনো মে জান হোতি হ্যায়, পাখা সে কুছ নেহি হোতা, হোসলো সে উড়ান হোতি হ্যায়।’
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী



