শাজনীন তাসনিম রহমানের ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী: একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মরণ
আজ ২৩ এপ্রিল, শাজনীন তাসনিম রহমানের ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৮ সালের এই দিনে রাতে রাজধানী ঢাকার গুলশান এলাকায় নিজ বাড়িতে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হন মাত্র ১৫ বছর বয়সী এই কিশোরী। শাজনীন তখন স্কলাসটিকা স্কুলের নবম শ্রেণির একজন মেধাবী ছাত্রী ছিলেন, যার জীবন অকালে ঝরে যায় এক ভয়াবহ অপরাধের শিকার হয়ে।
পরিবার ও পটভূমি
শাজনীন তাসনিম রহমান ছিলেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান ও বর্তমান চেয়ারম্যান শাহনাজ রহমানের কন্যা। তিনি চার ভাইবোনের মধ্যে একজন, যেখানে তাঁর বড় বোন সিমিন রহমান বর্তমানে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই পরিবারটি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে সুপরিচিত, কিন্তু শাজনীনের মৃত্যু একটি গভীর শোক ও বেদনার ছায়া ফেলে দিয়েছে তাদের জীবনে।
হত্যা মামলার বিচারিক যাত্রা
শাজনীন তাসনিম রহমানের ধর্ষণ ও হত্যার মামলাটি বিচারাধীন হয় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। ২০০৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল এই মামলার রায় ঘোষণা করেন, যেখানে ছয় আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। আসামিরা হলেন:
- শাজনীনের বাড়ির তৎকালীন গৃহকর্মী শহীদুল ইসলাম (শহীদ)
- বাড়ির সংস্কারকাজের দায়িত্ব পালনকারী ঠিকাদার সৈয়দ সাজ্জাদ মইনুদ্দিন হাসান
- হাসানের সহকারী বাদল
- বাড়ির গৃহপরিচারিকা দুই বোন এস্তেমা খাতুন (মিনু) ও পারভীন
- কাঠমিস্ত্রি শনিরাম মণ্ডল
বিচারিক আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স যায়। আসামিরা আপিল করেন, এবং ২০০৬ সালের ১০ জুলাই হাইকোর্ট শনিরাম মণ্ডলকে খালাস দেন, কিন্তু বাকি পাঁচ আসামির ফাঁসির আদেশ বহাল রাখা হয়।
আপিল ও চূড়ান্ত ফাঁসি
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে চার আসামি—হাসান, বাদল, মিনু ও পারভীন—আপিল বিভাগে আপিল করেন। আপিল বিভাগ তাদের আপিল মঞ্জুর করায় তারা অব্যাহতি পান। অন্যদিকে, ফাঁসির আদেশ পাওয়া আরেক আসামি শহীদুল ইসলাম জেল আপিল করেন, যা খারিজ হয়ে যায়। এরপর তিনি মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ আবেদন করেন, কিন্তু সেটিও আপিল বিভাগে খারিজ হয়। অবশেষে, ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর রাতে শহীদুল ইসলামের ফাঁসি কার্যকর হয়, যা এই মামলার একটি চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে চিহ্নিত হয়।
শাজনীন তাসনিম রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় একটি নির্মম অপরাধের কথা, যেখানে একটি তরুণ প্রাণের অকাল মৃত্যু এবং বিচারিক ব্যবস্থার দীর্ঘ যাত্রা সমাজে ন্যায়বিচারের গুরুত্বকে তুলে ধরে। এই ঘটনা বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা ও শিশু-নারী নির্যাতন বিরোধী সংগ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।



