কুষ্টিয়ায় মাজারে হামলা: মব ভায়োলেন্সের ভয়াবহতা ও সমাজের সংকট
কুষ্টিয়ায় মাজারে হামলা: মব ভায়োলেন্সের সংকট

কুষ্টিয়ায় মাজারে হামলা: মব ভায়োলেন্সের ভয়াবহতা ও সমাজের সংকট

বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্স বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, এটি ধীরে ধীরে একটি স্বাভাবিক সামাজিক‑রাজনৈতিক ঘটনায় রূপ নিচ্ছে। আইন-বিচারের জায়গা যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখন সেই শূন্যতা দখল করে নেয় আবেগ ও গুজব। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই প্রবণতা স্পষ্ট হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে—সমস্যাটি শুধু রাজনৈতিক সহিংসতায় সীমিত নেই, এটি গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে ধর্মীয় পরিসর, লোকায়ত সংস্কৃতি এবং সুফি মাজারভিত্তিক বিশ্বাসচর্চার সঙ্গে।

দৌলতপুরের মাজার হামলা: একটি ভয়াবহ উদাহরণ

এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও ভয়াবহ উদাহরণটি ঘটেছে আজ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে একদল লোক একটি মাজারে হামলা চালায়, ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে এবং সেই সহিংসতায় মাজারের পীর নিহত হন। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও হামলাকারীদের ঠেকানো যায়নি। ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে আনার’ কথা বলেছে, তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু এর আগেই একজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং একটি মাজার ধ্বংস হয়েছে। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে আইন কার্যকর হওয়ার আগেই মব কার্যকর হয়ে যায়।

একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়: মাজারে হামলার ধারাবাহিকতা

কুষ্টিয়ার এই ঘটনাটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনও বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এর আগেও বাংলাদেশে একাধিক মাজারে হামলা হয়েছে, পীর, খাদেম বা অনুসারীরা হেনস্তার শিকার হয়েছেন এবং সেগুলোর অনেকটাই ঘটেছে একই প্যাটার্নে—গুজব ছড়ানো, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তোলা, জনতা জড়ো হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সহিংসতা। কিছু দিন আগে বিবিসি বাংলার একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দসহ বিভিন্ন এলাকায় মাজারে হামলার ধারাবাহিকতা ও তার পেছনের কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে দেখানো হয়েছিল, কীভাবে হাজার হাজার মানুষ একত্র হয়ে পুলিশের সামনে বা পুলিশের পৌঁছানোর আগেই মাজারে ভাঙচুর চালিয়েছে এবং কীভাবে সেই সহিংসতার পরেও দোষীদের জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মব ভায়োলেন্সের সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা

আমরা যদি মব ভায়োলেন্সের সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করি—তাহলে দেখতে পাবো কোনও অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার যে প্রয়োজন—তাকে পাশ কাটিয়ে জনতা নিজেরাই যেন ‘বিচারক’ হয়ে উঠেছে। এই সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এর লক্ষ্যবস্তু প্রায়ই হয়ে উঠছে মাজার, দরবার শরিফ, বাউল আখড়া ও সুফিভিত্তিক ধর্মচর্চার স্থানগুলো। এসব পরিসর ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের প্রতীক। এখানে আনুষ্ঠানিক ধর্মশাস্ত্রের বাইরে লোকায়ত চর্চা, সংগীত, নৃত্য, নারী‑পুরুষের তুলনামূলক মুক্ত অংশগ্রহণ এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের আগমন দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই বহুত্ববাদী চরিত্রটাই একাংশের কাছে ‘সমস্যা’ হয়ে উঠছে। ধর্মের একক ও কঠোর ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মাজারগুলো ক্রমশ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক আতঙ্কের সৃষ্টি

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মাজারটি ছিল এমনই একটি স্থান, যেখানে স্থানীয় অনুসারীরা বিশ্বাসচর্চা করতেন। এই হামলার পর শুধু একটি স্থাপনা ধ্বংস হয়নি—এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, অনুসারীরা ভয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না। এই ভয় নতুন নয়। পত্র পত্রিকার খবর বলছে, রাজবাড়ী ও রাজশাহীর ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয় ও উদ্বেগ হচ্ছে—এই সেনা টহল, মাজার ঘিরে পুলিশের পাহারার পরেও ‘আবার হামলা হবে কিনা’। অর্থাৎ, মব ভায়োলেন্স ক্ষণস্থায়ী না থেকে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করছে।

রাষ্ট্রের ভূমিকা ও দুর্বলতা

এ ধরনের সহিংসতায় রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কুষ্টিয়ার ঘটনায় যেমন বলা হচ্ছে, ‘পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে’—এই বাক্যটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুব পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিয়ন্ত্রণ আসে কেন সবকিছু হয়ে যাওয়ার পরে? কেন আগাম তথ্য থাকা সত্ত্বেও, বা উত্তেজনার লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার পরেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না? একজন আইনের শিক্ষক, আইনজীবী ও সমাজবিশ্লেষক হিসেবে আমি এই জায়গাটিতে রাষ্ট্রের দুর্বলতার কথাই বলবো। পুলিশ ও প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করছে—কঠোর পদক্ষেপ নিলে রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কায় তারা কোনও কঠোর পদক্ষেপে যায় না। এই দ্বিধার ফলেই মবকারীরা বার্তা পায় যে তারা আসলে খুব বড় ঝুঁকিতে নেই। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক ক্ষেত্রে মামলা, গ্রেফতার বা বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়। ফলে সহিংসতা এক ধরনের ‘কম শাস্তিযোগ্য’ আচরণ হিসেবে সমাজে জায়গা পায়। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে মব কালচার আমাদের সমাজে ‘সংক্রামক রোগের মতো’ ছড়িয়ে পড়েছে—একবার কোথাও ছাড় পেলে অন্য জায়গায় তার অনুকরণ ঘটে।

ধর্মীয় অনুভূতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার

এই সহিংসতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—এটি ধর্মীয় অনুভূতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। কুষ্টিয়ার ঘটনায় যেমন কোরআন অবমাননার অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে, তেমনই আগের অনেক ঘটনায়ও ‘ধর্ম অবমাননা’ বা ‘ভ্রান্ত আকিদা’র অভিযোগ উসকে দেওয়া হয়েছে। অথচ এসব অভিযোগের বিচার করার একমাত্র বৈধ জায়গা আদালত। ধর্ম নিজে কখনও জনতাকে হত্যার অনুমতি দেয় না। কিন্তু মব ভায়োলেন্সে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসলে ধর্মকেই অপমান করা হয়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়ে যায় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—সে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হোক, লোকায়ত সুফি অনুসারী হোক বা বাউল শিল্পী হোক। কুষ্টিয়ার মতো এলাকায়, যেখানে লালনের দর্শন এখনও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ, সেখানে মাজারে আগুন দেওয়া মানে শুধু একটি স্থাপনা ধ্বংস নয়—এটি একটি দর্শনের ওপর আঘাত। এই আঘাত ধীরে ধীরে সমাজকে আরও সংকীর্ণ ও অসহিষ্ণু করে তোলে।

সমাজের প্রান্তিক মানুষের ক্ষতি

এসব ঘটনা দেখে শুধু রাগ বা শোক নয়, এক ধরনের গভীর অনিশ্চয়তাও কাজ করে। কারণ আজ যে মাজার পুড়লো, যে পীর মারা গেলেন—এটি কোনও একক বিশ্বাস বা গোষ্ঠীর সমস্যা নয়। এটি আমাদের সবার সমস্যা। এই অস্থির সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের প্রান্তিক মানুষরা। সুফি অনুসারী, বাউল, দরিদ্র ভক্ত, সংখ্যালঘু পরিবার—এরা প্রথম আঘাতটা পায়। মানবাধিকার আলাপে আমরা এটাকে বলি, ‘সিলেক্টিভ ভালনারেবিলিটি’, যেখানে দুর্বলদের ওপর সহিংসতা সহজ হয়ে ওঠে। কুষ্টিয়ার ঘটনা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শক্তিশালীদের বিরোধ মেটায় শক্ত কাঠামো, দুর্বলদের ক্ষেত্রে নেমে আসে জনতার লাঠি।

আয়না তুলে ধরা: একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি

আমি এই লেখা লিখছি কোনও সমাধান দেওয়ার জন্য নয়, বরং একটি আয়না তুলে ধরার জন্য। এই আয়নায় আমি একটি সমাজকে দেখি, যে সমাজ হয়তো ক্লান্ত, বিভ্রান্ত আর ক্ষুব্ধ—আর সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে মব সহিংসতায়। আমরা যদি এই আয়নায় নিজেকে না দেখি, তাহলে কুষ্টিয়ার ঘটনাটি শেষ ঘটনা হবে না। আজ মাজার পোড়ে, মানুষ মরে— এই বাক্যটি শুধু একটি ঘটনার বর্ণনা নয়, এটি আমাদের সময়ের একটি নির্মম সারকথা। প্রশ্ন শুধু এটুকুই থেকে যায়— এই অস্থিরতার আয়নায় নিজেকে দেখে আমরা কি কোনোদিন ভয়ের চেয়ে বিবেককে বড় হতে দেবো?

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।