যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে দান করা অন্তত ৮৯টি মরদেহ মার্কিন নৌবাহিনীর মাধ্যমে ইসরায়েলের সামরিক সার্জনদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে বলে গত ১৩ মে প্রকাশিত আল-জাজিরার একটি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দানকারীদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের প্রশ্ন, প্রিয়জনদের দেহ সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে—এ তথ্য আগে জানানো হলে তারা কি শরীর দানে সম্মতি দিতেন?
পরিবারের সদস্যদের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদায় বসে একদিন হঠাৎ একটি উদ্বেগজনক খবর পেলেন মেডিক্যাল কেস ম্যানেজার মরিয়ম ভলপিন। খবরটি পাঠিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউএসসি) এক শিক্ষানবিশ সাংবাদিক। জেনিফার নেহরা নামের ওই শিক্ষার্থী একটি অনুসন্ধানী দলের সদস্য ছিলেন। তারা তদন্ত করছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য দান করা মরদেহগুলো মার্কিন সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে—একটি গুরুতর অভিযোগ নিয়ে। আরও অভিযোগ উঠেছে, এর মধ্যে কিছু মরদেহ ইসরায়েলের সামরিক সার্জনদের প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করা হয়েছে।
মরিয়ম ভলপিন আল-জাজিরাকে বলেন, “খবরটা শুনে আমার পেট মোচড় দিয়ে উঠেছিল। শারীরিকভাবে খুব খারাপ লাগছিল।” ২০২১ সালে তার ১০১ বছর বয়সী মা জ্যানেট মারা যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমানবাহিনীর নার্স ছিলেন জ্যানেট। মৃত্যুর আগে তিনি নিজের শরীর ইউএসসিতে দান করে গিয়েছিলেন। এখন মরিয়মের আশঙ্কা, তার মায়ের দেহ হয়তো ইসরায়েলের সামরিক সার্জনদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে, বিশেষ করে গাজায় চলমান যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য।
আল-জাজিরার অনুসন্ধান
আল-জাজিরার 'ডাইরেক্ট ফ্রম' ডকুমেন্টারি সিরিজে মরিয়মসহ আরও কয়েকজন পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তারা সবাই শঙ্কিত যে, তাদের প্রিয়জনদের মরদেহ ইসরায়েলের সেনাদের প্রশিক্ষণে ব্যবহার হয়েছে কি না। ২০২৫ সালের সেই অনুসন্ধান চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশ করেছিলেন ইউএসসির শিক্ষানবিশ সাংবাদিকরা। আল-জাজিরা তাদের সঙ্গেও কথা বলেছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়—ইউএসসি ও ইউসিএসডি—মার্কিন নৌবাহিনীর মাধ্যমে ইসরায়েলি সামরিক সার্জনদের জন্য মরদেহ সরবরাহ করেছে।
জেনিফার গোমেজ, যার নানি শরীর দান করেছিলেন, বলেন, “আমাদের পরিবারের মরদেহে প্রশিক্ষণ নিতে আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনী আসছে, এটা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। বিশেষ করে এমন একটি বাহিনী, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আছে এবং যারা এখনো মানুষ মারছে।”
প্রশিক্ষণের পদ্ধতি
নথিপত্র অনুসারে, ২০১৮ সাল থেকে ইউএসসি মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে কমপক্ষে ৮৯টি তাজা মরদেহ সরবরাহ করেছে, যা ইসরায়েলের সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রবন্ধে দেখা যায়, ইসরায়েলের ফরওয়ার্ড সার্জিক্যাল টিমের জন্য চার দিনের কমব্যাট ট্রমা সার্জারি কোর্স চালানো হয়েছে। এতে দান করা মরদেহগুলোকে 'পারফিউশন' পদ্ধতিতে কৃত্রিমভাবে রক্ত সঞ্চালন করে জীবন্তের মতো করে তোলা হয়। মরদেহের ভেতর দিয়ে কৃত্রিম রক্ত পাম্প করা হতো। তৈরি করা হতো গুলির আঘাত, আইইডি বিস্ফোরণের মতো যুদ্ধকালীন ক্ষত।
মার্কিন নৌবাহিনী বলেছে, অভিজ্ঞ সার্জনরা শল্যচিকিৎসার যন্ত্র দিয়ে এসব কৃত্রিম আঘাত তৈরি করতেন। ইউএসসি ও ইউসিএসডি—দুই বিশ্ববিদ্যালয়ই এ প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল। বিশেষ করে ইউসিএসডি থেকে অনেক মরদেহ ইউএসসিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত প্রায় ১২৪টি মরদেহ স্থানান্তরিত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ই দাবি করেছে, এটি শিক্ষামূলক কর্মসূচি এবং ইসরায়েলের চিকিৎসকেরা বেসামরিক ছিলেন।
নৈতিক প্রশ্ন
মরদেহ দানকারীরা কখনো জানতে পারেননি যে তাঁদের দেহ সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহার হতে পারে। চিকিৎসক মোহাম্মদ রাদ প্রশ্ন তুলেছেন, “দানকারীরা যদি জানতেন যে তাদের শরীর কৃত্রিম রক্ত সঞ্চালন করে বিদেশি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে লাগবে, তাহলে কি তারা রাজি হতেন?” জেনিফার গোমেজের উত্তর, “না।” তিনি আরও বলেন, “মানুষ শরীর দান করে পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য। কেউ ভাবে না যে তার দেহ সামরিক বাহিনীকে আরও দক্ষ করে তুলবে।”
এ ঘটনা প্রকাশের পর অনেকে শরীর দানের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ওয়েন্ডি স্মিথ বলেন, “আমি গণহত্যা বা অনাহারকে কোনোভাবেই সমর্থন করতে চাই না।” এই অনুসন্ধান বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। মৃত্যুর পর মানুষের দেহ কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দাতাদের সম্মতির সীমা নিয়ে নতুন করে নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে।



