ভিন্নমত কি সত্যিই শত্রুতা? সমাজের অসহিষ্ণুতা ও মানবিক সংকট
ভিন্নমত কি শত্রুতা? অসহিষ্ণু সমাজের মানবিক সংকট

ভিন্নমত কি সত্যিই শত্রুতা? নাকি আমরা নিজেরাই এই সমাজটাকে এমন জায়গায় নিয়ে এসেছি, যেখানে কোনো প্রশ্ন করা মানেই শত্রু হয়ে যাওয়া? ২০২৪ সালের বাংলাদেশে এই প্রশ্নটা আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। চারপাশে তাকালে দেখি, মানুষ আর মানুষের সঙ্গে কথা বলে না, মুখোমুখি বসে যুক্তি দেয় না; বরং একে অপরকে চিহ্নিত করে, আঙুল তোলে, আর এক মুহূর্তেই তাকে ‘ওপক্ষের লোক’ বানিয়ে ফেলে। কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি আমরা?

মতের ভিন্নতা ও সম্পর্কের অবনতি

একটা সময় ছিল, মানুষ মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও আলোচনা করতো। তর্ক হতো, বিতর্ক হতো, কিন্তু সম্পর্ক ভাঙতো না। আজ সেই জায়গাটা হারিয়ে গেছে। এখন কেউ যদি একটু ভিন্নভাবে ভাবে, সে যেই হোক, যতই সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলুক, সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর আক্রমণ নেমে আসে। তাকে কোনো না কোনো রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়। যেন মানুষ আর মানুষ নেই, সে শুধু ‘দলের প্রতিনিধি’।

সরকার পরিবর্তনের পরেও একই চিত্র

২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনের পর আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম, হয়তো এবার কিছু বদলাবে। রাজনীতির ভাষা বদলাবে, আচরণ বদলাবে, অন্তত সহনশীলতার জায়গাটা ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের বারবার হতাশ করেছে। ক্ষমতা বদলেছে, কিন্তু রাজনীতির মনস্তত্ত্ব বদলায়নি। একই ভাষা, একই আক্রমণ, একই প্রতিহিংসা, শুধু মুখগুলো বদলেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক চক্র ও স্বাভাবিকীকৃত অসহিষ্ণুতা

আমরা কি তাহলে শুধু এক ধরনের রাজনৈতিক চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি? এক দল ক্ষমতায় এসে অন্য দলকে দমন করবে, নিষিদ্ধ করবে আর পরবর্তীকালে সেই অন্য দল ক্ষমতায় এসে একই কাজ করবে? সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি হলো— এই সংস্কৃতি আমাদের কাছে এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আজ আপনি যদি কোনো বিষয়ে সমালোচনা করেন, তা সে স্বাস্থ্য খাত হোক, শিক্ষা, অর্থনীতি বা কোনো মানবিক বিপর্যয়, আপনাকে আগে দেখে নেওয়া হয় আপনি ‘কার পক্ষে’। আপনি শিশু মৃত্যুর কথা বলছেন? তাহলে আপনি নিশ্চয়ই কোনো দলের এজেন্ডা চালাচ্ছেন। আপনি দুর্নীতি নিয়ে লিখছেন? তাহলে আপনি হয়তো ‘অন্য পক্ষের প্রচারক।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হামে শিশু মৃত্যু: মানবিক সংকটের উদাহরণ

সম্প্রতি হাম রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু নিয়ে যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তা হচ্ছে কই? এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা কতটা অসাড় হয়ে গেছি। যেখানে শোক, প্রশ্ন, দায়বদ্ধতা থাকার কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে— ঠাট্টা, বিদ্রূপ, রাজনৈতিক খোঁচাখুঁচি। যারা এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে, তাদের ওপরই নেমে এসেছে ট্যাগিং আর বুলিং। ভাবুন একবার, পাঁচশোর বেশি শিশু মারা গেছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে, তা জাতীয় সংকটে পরিণত হতো। ব্যাপক তদন্ত হতো, দায়িত্ব নির্ধারণ হতো, রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতো। আর দোষীদের খুঁজে অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি করা হতো। কিন্তু আমাদের এখানে? আমরা সেটাকেও দলীয় বিতর্কে নামিয়ে এনেছি।

মানবিকতার সংকট

আমরা কি একটি বিষয় বুঝতে পারছি না, সংকটটি শুধু রাজনীতির নয়— এটি আমাদের মানবিকতারও। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে মানুষের দুঃখ-কষ্টও পক্ষ দেখে মূল্যায়ন করা হয়। কেউ যদি ‘আমার দলের’ হয়, তবে তার কষ্ট বাস্তব; না হলে তা উপহাসের বিষয়। এই মানসিকতা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনা

বিশ্বের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, ভিন্নমতকে কীভাবে শক্তি হিসেবে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক মতভেদ আছে, কিন্তু সেখানে নীতিগত প্রশ্নে বিতর্কের মূল্য আছে। ব্রিটেনে পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। ইউরোপের দেশগুলোতে ভিন্নমতকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়, বরং প্রয়োজনীয় ভারসাম্য হিসেবে দেখা হয়।

অপরদিকে, যখন রাজনীতি ঘৃণার ওপর দাঁড়ায়, তখন তার ফলও আমরা বিশ্বে দেখেছি। ভারতের সাম্প্রতিক ধর্মীয় মেরুকরণ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, কিংবা শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সব জায়গাতেই একটি জিনিস স্পষ্ট: যখন মানুষকে বিভক্ত করে রাজনীতি করা হয়, তখন শেষ পর্যন্ত হারে সমাজই।

তরুণদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা

আমাদের দেশও সেই পথে হাঁটছে কি? সবচেয়ে কষ্ট হয় যখন দেখি, এই অসহিষ্ণুতা এখন তরুণদের মধ্যেও ঢুকে পড়ছে। যে তরুণদের আমরা ভেবেছিলাম নতুন পথ দেখাবে, তারা অনেক সময় একই ভাষায় কথা বলছে। তারা যুক্তি শেখার আগেই শিখছে, ‘কাকে অপমান করতে হয়’। তারা মতো প্রকাশের আগেই শিখছে, ‘কাকে ট্যাগ দিতে হয়।’ ফলে দুই ধরনের বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। একদল তরুণ এই ঘৃণার রাজনীতির অংশ হয়ে উঠছে। আরেকদল ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছে। তারা মনে করছে, এই জায়গা তাদের জন্য নয়। এই হতাশা, এই বিচ্ছিন্নতা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ। কারণ রাজনীতি যদি সৎ, মেধাবী, চিন্তাশীল তরুণদের হারায়, তাহলে সেটি আরও বেশি অগভীর, আরও বেশি স্বার্থপর হয়ে উঠবেই।

মুক্তির পথ

আমরা কি সত্যিই এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কেউ কিছু বলার আগে ১০ বার ভাববে, ‘আমাকে কে কী বলবে?’ আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে সত্য বলার চেয়ে নিরাপদ হলো চুপ থাকা? মুক্তির পথ কি নেই? পথ আছে, কিন্তু সেটি সহজ নয়।

প্রথম: ভিন্নমতকে শত্রু না ভেবে গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে দেখা

প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে, ভিন্নমত শত্রুতা নয়। এটি গণতন্ত্রের ভিত্তি। কেউ সমালোচনা করলে তাকে শত্রু ভাবা মানে নিজেকে প্রশ্নের বাইরে রাখতে চাওয়া, যা শেষ পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার দিকে নিয়ে যায়।

দ্বিতীয়: যুক্তি দিয়ে বিচার

দ্বিতীয়ত, আমাদের শিখতে হবে মানুষকে দল নয়, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে। একজন মানুষ একইসঙ্গে কোনো দলের সমর্থক হতে পারেন এবং সেই দলের সমালোচকও হতে পারেন। এই জটিলতা মেনে নেওয়ার মধ্যেই পরিপক্কতা।

তৃতীয়: শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মিডিয়ায় পরিবর্তন

তৃতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও মিডিয়াকে এমন জায়গা তৈরি করতে হবে, যেখানে ভিন্নমত গ্রহণযোগ্য হবে। যেখানে বিতর্ক হবে, কিন্তু অপমান হবে না।

সবচেয়ে বড় কথা: নিজেদের বদলাতে হবে

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের নিজেদের বদলাতে হবে। কারণ এই সমাজ আমরা সবাই মিলে তৈরি করছি। আমরা যখন কাউকে গালি দিই, যখন কাউকে ট্যাগ দিই, তখন আমরাই এই অসহিষ্ণু সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করি। ঘৃণার রাজনীতি কখনও হঠাৎ করে জন্ম নেয় না, তা তৈরি হয় একটু একটু করে, একটি কটূক্তি, একটি অন্যায় ট্যাগ, একটি অযৌক্তিক আক্রমণ, একটি নীরব সহমত। আমরা যখন কাউকে শুনি না, যখন প্রশ্নকে স্বাগত না জানিয়ে তাকে দমন করি, তখন আমরা নিজের অজান্তেই এই অন্ধকারকে শক্তিশালী করি।

উপসংহার

আজ যদি কেউ কথা বলতে ভয় পায়, কাল কেউ সত্য বলতে সাহস হারাবে। এরপর একসময় দেখা যাবে, সবাই চুপ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, বিভাজন আর অবিশ্বাস এই সমাজকে ভেঙে দিচ্ছে। একটি সভ্য সমাজ কখনোই নিখুঁত ঐক্যের ওপর দাঁড়ায় না; বরং দাঁড়ায় ভিন্নতার ভেতর সহাবস্থানের ওপর। সেখানে মতের পার্থক্য থাকে, কিন্তু মানুষ মানুষকে শত্রু মনে করে না। আমরা যদি সেই জায়গা থেকে সরে গিয়ে শুধু ঘৃণার ওপর দাঁড়াতে চাই, তাহলে শেষ পর্যন্ত হারাবো আমরাই, রাষ্ট্র হারাবে, সমাজ হারাবে, ভবিষ্যৎ হারাবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অফ লেস্টার, যুক্তরাজ্য।