শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে ‘আর না’ সমাবেশ শাহবাগে
শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে ‘আর না’ সমাবেশ

শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ‘আর না’ স্লোগান ও পোস্টার নিয়ে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ রোববার বিকেলে ‘আর না’—এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তারা বলেন, আসল উন্নত দেশ সেটাই, যেখানে নারী ও শিশুরা নিরাপদে বাঁচতে পারে। একটা আট বছরের শিশু যদি ধর্ষণ ও খুনের শিকার হয়, এটা শুধু একটা পরিবারের কষ্ট নয়; বরং পুরো সমাজের ব্যর্থতা। এ ধরনের নারকীয় ঘটনার দ্রুত বিচার ও অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

সমাবেশের দাবি

সমাবেশের শুরুতে খিলগাঁও মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী আয়েশা সিদ্দিকা আনিসা বেশ কিছু দাবি পড়ে শোনান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্ষণের সব মামলার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করতে হবে, কোনো মামলা সালিস বা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যাবে না; প্রতিটি মামলার অগ্রগতি ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে প্রকাশ্যে জানাতে হবে; নারী নিরাপত্তা, জরুরি সহায়তা ও পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত নারী পুলিশ ইউনিট, ২৪ ঘণ্টার জাতীয় হটলাইন ও দ্রুত অবস্থান শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, প্রতিটি অভিযোগ বাধ্যতামূলকভাবে নথিভুক্ত করতে হবে ও যে কর্মকর্তা অভিযোগ নিতে অস্বীকার করেন বা আপসে চাপ দেন, তাঁর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা ও আত্মরক্ষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বয়সোপযোগী ‘ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ’ সচেতনতা, আত্মরক্ষা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা শিক্ষা চালু করা; উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সংগঠনে কার্যকর যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ ও অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল গঠন ও সক্রিয় করা এবং ভুক্তভোগী সহায়তা ও প্রমাণ সংগ্রহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রত্যেক জেলা সদর হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারকে প্রয়োজনীয় জনবল, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ফরেনসিক পরীক্ষা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, মনোসামাজিক ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ করা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বক্তাদের বক্তব্য

ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিম মাসুদ রাদিফ লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। তিনি বলেন, ‘আজ একটা আট বছরের বাচ্চা যদি ধর্ষণ ও খুনের শিকার হয়, এটা শুধু একটা পরিবারের কষ্ট নয়, এটা পুরো সমাজের ব্যর্থতা। শুধু আলোচনা নয়, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট নয়। দ্রুত বিচারের মধ্য দিয়ে কঠোর শাস্তি দিতে হবে, যেখানে অপরাধ করার আগে মানুষ ভয় পায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘নারী আর শিশুদের নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, এটা তাদের অধিকার। আজ আমরা একটা কথাই বলতে এসেছি—আর না। আমরা বিচার চাই, নিরাপত্তা চাই, মানবিক বাংলাদেশ চাই।’

নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য অনিক রায় বলেন, বাংলাদেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনায় পপুলিস্ট বক্তব্য এবং পপুলিস্ট কায়দায় বিচার করার চেষ্টা চলছে। শুধু মুখরোচক বক্তব্য দিয়ে একটি সামাজিক ব্যাধিকে আটকানো যাবে না। তিনি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির দাবি তুলে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশকে একটি আলাদা হটলাইন নম্বর চালু করতে হবে, যেখানে যেকোনো নারী বিপদে পড়লে তাঁর একটি কলে অবস্থান শনাক্ত করে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো যায়।

গণবিপ্লবী উদ্যোগের সংগঠক আরিফ সোহেল বলেন, ‘আমরা আর কোনো শিশুকে নির্যাতিত হতে দেখতে চাই না, আর কোনো ধর্ষণের ঘটনা দেখতে চাই না, আর কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা দেখতে চাই না, আমরা চটকদার কোনো বক্তব্য দেখতে চাই না।’ তিনি নারীদের যৌন হয়রানি ও অনলাইনে সাইবার বুলিংয়ের কড়া সমালোচনা করেন।

আইনজীবী প্রিয়া হাসান চৌধুরী বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সুষ্ঠু বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে, যদি আবেগ থেকে বলা হয় যে আসামিপক্ষের আইনজীবী থাকতে পারবে না। এ ছাড়া কেন তদন্ত চলতেই থাকে, এ ক্ষেত্রে বাধা কোথায়, সেখানেও নজর দেওয়া দরকার।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) কর্মকর্তা ও আইনজীবী মশিউর রহমান বলেন, বিচারহীনতা ও বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রতার কারণে আজ সমাজে অস্থিরতা এবং ধর্ষকেরা বুক ফুলিয়ে চলতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই দ্রুত বিচার হোক। কিন্তু সেই বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন আইনের কোনো ব্যত্যয় না হয়।’

গভর্ন্যান্সের ব্যর্থতার দায়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা চিকিৎসক তাসনিম জারা সমাপনী বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। আইন কার্যকর বা প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে। তদন্তের জন্য পুলিশের জনবল, প্রশিক্ষণ, গবেষণাগার, তদন্তকাঠামো থাকা জরুরি; অন্যথায় আইন কাগজেই থাকবে, মানুষ বিচার পাবে না এবং অপরাধ চলতেই থাকবে। তিনি বলেন, বিচারহীনতার চক্রে অপরাধ বাড়ে। গভর্ন্যান্সের ব্যর্থতার দায় নিতে হবে এবং জবাবদিহি চাইতে হবে। তিনি দ্রুত সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দেন, যাতে সহিংসতার শিকার ব্যক্তি তাৎক্ষণিক নম্বরে ফোন দিয়ে নিকটস্থ পুলিশের সহায়তা পেতে পারেন।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজানা আফিফা ও মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী আজওয়াজ ইউশা। সঞ্চালক ছিলেন এনসিপির সাবেক নেতা মুশফিক উস সালেহীন।