তালেবানের নতুন আইনে বাল্যবিবাহ বৈধ, নারীদের তালাকের অধিকার খর্ব
তালেবানের আইনে বাল্যবিবাহ বৈধ, তালাকের অধিকার খর্ব

আফগানিস্তানে তালেবান সরকার একটি নতুন আইন অনুমোদন করেছে, যা কার্যত প্রথমবারের মতো বাল্যবিবাহকে বৈধতা দিচ্ছে। অধিকারকর্মীরা এই আইনকে 'লজ্জাজনক' আখ্যা দিয়ে বলছেন, এর ফলে স্বামীর অমতে কোনো কিশোরী বা তরুণীর পক্ষে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক চাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

নতুন আইনের বিধান

নতুন আইন অনুযায়ী, কোনো মেয়ে যদি পরে জানায় যে তাঁর অমতে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তবু স্বামী রাজি না থাকলে তিনি তালাক পাবেন না। এছাড়া কেবল স্বামীর অনুপস্থিতি বা স্ত্রীর ভরণপোষণে ব্যর্থতার কারণে কোনো নারী তাঁর স্বামীকে তালাক দিতে পারবেন না।

বাল্যবিবাহের হার উদ্বেগজনক

আফগানিস্তানে জোরপূর্বক ও বাল্যবিবাহের সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মূলত ১১ বছরের পর মেয়েদের পড়াশোনা নিষিদ্ধ করার কারণেই এমনটি ঘটছে। একটি অনানুষ্ঠানিক হিসাবে দেখা গেছে, পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ৭০ শতাংশ মেয়েকে অল্প বয়সে বা জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব বিয়ের ৬৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েদের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিবাদ ও সমালোচনা

চলতি সপ্তাহে কাবুলে এই নতুন আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকটি নারী অধিকার সংগঠন এই আইনকে নারী ও শিশুদের ওপর একধরনের পদ্ধতিগত সহিংসতার রূপ আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে। ফাতিমা নামের একজন অধিকারকর্মী বলেন, 'শত শত নারীবিরোধী আদেশ জারির পর তালেবান এখন আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর ভেতরে বাল্যবিবাহকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বদলে তালেবান এখন লজ্জাজনক নারীবিরোধী আদেশ জারি করা এবং মানুষের স্বাধীনতা দমনের কাজে ব্যস্ত।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাতিসংঘের উদ্বেগ

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশন (ইউএনএএমএ) এই আইনি কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, 'নতুন এই আদেশের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদের বিষয়টি আইনি রূপ দেওয়া হয়েছে, যা আফগান নারী ও মেয়েদের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল এবং আইন ও এর প্রয়োগ—উভয় দিক থেকেই পদ্ধতিগত বৈষম্যকে আরও পাকাপোক্ত করেছে।' ইউএনএএমএর জর্জেট গ্যাগনন বলেন, 'নতুন এই আইন একটি ব্যাপক এবং গভীর উদ্বেগজনক প্রক্রিয়ার অংশ, যার মাধ্যমে আফগান নারী ও মেয়েদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে...এটি এমন একটি ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করে, যেখানে আফগান নারী ও মেয়েদের স্বাধীনতা, সুযোগ এবং ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা হবে।'

তালেবানের প্রতিক্রিয়া

তবে নতুন এই আইনের সমালোচনা নাকচ করে দিয়েছেন তালেবান সরকারের এক মুখপাত্র। তালেবান পরিচালিত জাতীয় রেডিও ও টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'যাঁরা সমালোচক এবং যাঁদের ইসলাম, ধর্ম ও ইসলামী ব্যবস্থার মূল ভিত্তি নিয়ে সমস্যা আছে, তাঁদের বিক্ষোভে আমাদের পাত্তা দেওয়া উচিত হবে না।'

বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের দুর্দশা

আফগানিস্তান হিউম্যান রাইটস সেন্টারের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটিতে বাল্যবিবাহের শিকার বেশির ভাগ মেয়েই পারিবারিক সহিংসতা ও মারাত্মক মানসিক যন্ত্রণার শিকার। চলতি মাসের শুরুতে মধ্য আফগানিস্তানের দায়কুন্দি প্রদেশে স্বামীর পিটুনিসহ কয়েক মাসের পারিবারিক নির্যাতনের পর ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী মারা যায়। তার বাবা জানায়, আট মাস আগে চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের মাত্র দুই মাস পর থেকেই নির্যাতন শুরু হয়। তিনি আরও জানান, প্রতিবার মারধরের পর স্থানীয় বয়স্ক নেতারা এসে মীমাংসা করতেন এবং মেয়েটিকে ওই সংসারেই থাকতে বাধ্য করতেন।

মানবাধিকার কমিশনের বক্তব্য

আফগানিস্তান স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের আবদুল আহাদ ফারজাম বলেন, তালেবানের নতুন এই আইন এবং এর পেছনের দৃষ্টিভঙ্গি বাল্যবিবাহকে বৈধতা দেয়। এটি বিয়ের ক্ষেত্রে স্বাধীন মতামতের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীদের এই অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করে। তিনি আরও বলেন, 'এই আইন পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে এবং নারীদের অধীন ও আইনিভাবে অসম অবস্থানে ঠেলে দেয়।'