আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের সংকট: সভ্যতার রথ কি চূর্ণ হবে?
আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের সংকট: সভ্যতার রথ কি চূর্ণ হবে?

বর্তমানে আমরা এক উদ্বেগজনক পৃথিবীতে বসবাস করছি। মানবসভ্যতা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বৈষয়িক উন্নতিতে চরম উৎকর্ষ লাভ করেছে বলে দাবি করা হলেও, মানুষের মনস্তত্ত্ব ও আচরণে তার প্রতিফলন আজ কোথায়? নীতি-নৈতিকতা, সভ্যতা-ভব্যতা, উদারতা ও পারস্পরিক সৌজন্যবোধ কি এই আধুনিক পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেবে? আমরা প্রকৃতপক্ষে কোন যুগে বসবাস করছি এবং এই বন্ধনহীন, মর্যাদাহীন যুগের কী নামকরণ করা যেতে পারে—তা নিয়েই আজ চিন্তাশীল সমাজ উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত।

অতীতের নিয়মকানুন বনাম বর্তমানের কদর্যতা

ইতিহাসের পাতা উলটালে দেখা যায়, প্রাচীন কিংবা মধ্যযুগেও যখন যুদ্ধবিগ্রহ ও কূটনীতির আদিম রূপ বিরাজমান ছিল, তখনও রাষ্ট্রসমূহ পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু অলিখিত নিয়মকানুন মেনে চলত। ন্যূনতম মর্যাদা ও সম্মানবোধ রক্ষা করে চলত; কিন্তু আজকের এই তথাকথিত সভ্য পৃথিবীতে এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের প্রতি যখন সামান্যতম কূটনৈতিক সৌজন্যতা প্রদর্শনেও কার্পণ্য করে, তখন আমরা হতবাক হই, বারুদ্ধ হই! পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের স্থান আজ দখল করেছে ঔদ্ধত্য, অহংকার ও একে অপরকে তুচ্ছতাচ্ছল্য করার এক কুৎসিত প্রবণতা।

প্রকাশ্য হুমকি ও বলপ্রয়োগের নীতি

আজ বিশ্ব রাজনীতিতে শিষ্টাচারের স্থান নিয়েছে প্রকাশ্য হুমকি ও বলপ্রয়োগের নীতি। এক রাষ্ট্র অবলীলায় অন্য রাষ্ট্রকে দখল করে নেওয়ার কিংবা মারণাস্ত্রের আঘাতে মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার আস্ফালন করছে। চরম লজ্জার বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজ দেশে অতিথি হিসাবে দাওয়াত দিয়ে এনেও অবমাননা করা হচ্ছে! ফলে আমন্ত্রিত রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রতিনিধিরা ক্ষুব্ধ ও মনঃকষ্ট নিয়ে প্রস্থান করছেন। এমনকি বহুপক্ষীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে জোরপূর্বক বা অপমানজনকভাবে বের করে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আধুনিক মোড়লতন্ত্র ও আদিম হিংস্রতা

বিশ্ব জুড়ে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের এই অভাব সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’—এই প্রবাদের সার্থক প্রতিফলনও দৃশ্যমান। অতীত যুগের লাঠিয়াল বাহিনী যেমন পেশিশক্তি ও কর্কশ ভাষায় বা নির্মম পন্থায় নিজেদের আধিপত্য কায়েম করত, আধুনিক বিশ্বের কোনো কোনো মোড়ল রাষ্ট্রের ভাষা ও আচরণ যেন তার চেয়েও অকথ্য ও অসহনীয়। অস্ত্র ও গায়ের জোরে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ বিজয়ের বড়াই, অন্যদিকে আদিম যুগের হিংস্রতা—তাহলে আদিম যুগের সাথে এই আধুনিক যুগের ফারাক কোথায়?

ভয়ের ভিত্তিতে সম্মান

বর্তমান বিশ্বে এক দেশ অন্য দেশকে যেটুকু সম্মান প্রদর্শন করে, তা বলতে গেলে শ্রদ্ধাবোধ থেকে নয়, বরং বেশির ভাগটা পরমাণু বা সমরাস্ত্রের ভয়ে। অথচ বিপুল অস্ত্রাগার গড়ে তুলেও কোনো পরাশক্তি আজ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করতে পারছে না; বরং যুদ্ধ ও হিংসা কেবলই ধ্বংসের বিস্তার ঘটাচ্ছে।

উপসংহার: শিষ্টাচার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জরুরি প্রয়োজন

এই আত্মঘাতী পথ থেকে সরে এসে যদি বিশ্বনেতৃত্ব পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করে, তাহলে সভ্যতার এই রথ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়া অনিবার্য। অতএব, ক্ষমতার দম্ভ পরিহার করে বিশ্বশান্তি ও মানবতার স্বার্থে আন্তর্জাতিক সৌজন্যবোধ ফিরিয়ে আনা হোক বর্তমান বিশ্বনেতাদের প্রধান অঙ্গীকার।