ইসলামাবাদে ইরান-মার্কিন শান্তি আলোচনা ব্যর্থ, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দায়ী করলেন ইরানি নেতারা
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, একটি চুক্তির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ মুহূর্তে আলোচনা ভেস্তে গেছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের একচুলও ছাড় না দেওয়া, বারবার অবস্থান পরিবর্তন এবং নানা ধরনের চাপই এ ব্যর্থতার মূল কারণ।
ইরানের নেতাদের অভিযোগ
আব্বাস আরাগচি বলেন, যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে ইরান সম্পূর্ণ সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, গত ৪৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই আলোচনায় ইরান আন্তরিকভাবে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেও তারা বাধার মুখে পড়ে। তিনি আরও লেখেন, ‘কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি। সদিচ্ছার প্রতিদান সদিচ্ছা, আর শত্রুতার প্রতিদান শত্রুতা।’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও আলোচনার ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকেই দায়ী করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘মার্কিন সরকার তাদের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব ত্যাগ করে ইরানি জাতির অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর উপায় অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যাবে।’ তিনি বলেন, ওয়াশিংটন যদি তাদের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব ত্যাগ করে এবং ইরানের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখায়, তবে এখনো একটি সমঝোতা সম্ভব।
মার্কিন হুমকি ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী সব জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনী অবরোধ আরোপ করবে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, সোমবার সকাল ১০টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে ইরানের সব বন্দরে এই অবরোধ কার্যকর হবে, যা ইরানের স্থানীয় সময় অনুযায়ী বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট। সেন্টকম আরও জানায়, এ ব্যবস্থা সব দেশের জাহাজের ওপর সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে, তবে অন্যান্য দেশের বন্দরগুলোর মধ্যে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে।
ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, এই অবরোধ ইরানের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। গালিবাফ আরও বলেন, আলোচনার সময় তেহরান বেশ কিছু ইতিবাচক প্রস্তাব দিয়েছে, যা আলোচনাকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে গালিবাফ বলেন, ‘আপনারা যদি যুদ্ধ চান, আমরা যুদ্ধ করব; আর যদি যুক্তির পথে আসেন, আমরা যুক্তিতেই সাড়া দেব।’ পার্লামেন্ট স্পিকার আরও বলেন, ‘আমরা কোনো হুমকির কাছে মাথা নত করব না। তারা চাইলে আবারও আমাদের ইচ্ছাশক্তি পরীক্ষা করে দেখতে পারে—তাতে আমরা তাদের আরও বড় শিক্ষা দিতে পারব।’
আলোচনার প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা বৈরিতা কাটিয়ে উঠতে এই আলোচনা ব্যাপক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে, শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান আলোচনাকে ব্যর্থ করে দেয় বলে ইরানি নেতারা অভিযোগ করেছেন।
এদিকে, মার্কিন হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের দৃঢ় অবস্থান দেখে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারে। তবে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের মনোভাব পরিবর্তন করে, তবে এখনো একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতা সম্ভব। ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।



