নেপালের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা: বালেন্দ্র শাহের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ
নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শুক্রবার (২৭ মার্চ) শপথ নিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী সাবেক র্যাপার ও কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহ। তার এই উত্থানকে বিশ্লেষকরা নেপালের দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও অভিজাততান্ত্রিক রাজনীতির অবসান হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
র্যাপার থেকে সরকারপ্রধান: বালেন্দ্র শাহের অভূতপূর্ব যাত্রা
কাঠমান্ডুর এক আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক পরিবারে জন্ম নেওয়া বালেন্দ্র শাহ পেশায় একজন প্রকৌশলী। ২০১৩ সালে একটি র্যাপ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো আলোচনায় আসেন। ২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দ্রুত গতি পায়। মেয়র থাকাকালে শহর পরিষ্কার, ঐতিহ্য রক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অনড় অবস্থান তাকে যুবসমাজের আইকনে পরিণত করে।
নতুন গানে তোলপাড়: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক আগমুহূর্তে বালেন্দ্র শাহ নেপালের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে একটি নতুন গান প্রকাশ করেছেন। ‘বালেন’ নামে পরিচিত এই জনপ্রিয় নেতার গানটি প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২০ লাখের বেশি মানুষ দেখেছে। গানের কথায় তিনি নেপালিদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘অবিভক্ত নেপালি, এবার ইতিহাস তৈরি হচ্ছে।’
এই গানটি মূলত তার সেই পুরনো দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন তিনি র্যাপ সংগীতের মাধ্যমে নেপালের দুর্নীতি ও সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর ও ২০২৫-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় তার প্রতিবাদী গানগুলো আন্দোলনকারীদের মূল সংগীতে পরিণত হয়েছিল।
নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়: প্রথাগত রাজনীতির পতন
গত ৫ মার্চের সাধারণ নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহের দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) প্রথাগত বড় দলগুলোকে হটিয়ে নিরঙ্কুশ জয় পায়। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির দীর্ঘদিনের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ঝাপা-৫ আসনেও তাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন বালেন্দ্র। এই বিজয় নেপালের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ: নতুন সরকারের করণীয়
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বালেন্দ্র শাহের সামনে এখন পাহাড়সম প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারে ১২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, বিচার বিভাগীয় সংস্কার এবং কঠোর দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং ২০২৫ সালের গণ-অভ্যুত্থানের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের মতো বিষয়গুলো তার সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ নেপালি শ্রমিকের সংকট নিরসনও হবে তার অন্যতম প্রধান পরীক্ষা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বালেন্দ্র শাহের এই উত্থান শুধু নেপালের রাজনীতিতে নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তার সাফল্য বা ব্যর্থতা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের যুব-নেতৃত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।



