পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সড়কে নামাজ পড়া বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির বিধায়ক অর্জুন সিং। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এখন থেকে রাস্তায় কোনো ধর্মীয় জমায়েত বা প্রার্থনা মেনে নেওয়া হবে না।
অর্জুন সিংয়ের বক্তব্য
ইন্ডিয়া টুডে টিভিকে অর্জুন সিং বলেন, ক্যাবিনেট মিটিংয়ে মুখ্যমন্ত্রী একাধিক নির্দেশ দিয়েছেন। রাস্তায় নামাজ পড়া বরদাশত করা হবে না। মসজিদে নামাজ পড়লে কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু রাস্তায় পড়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, গরু পাচার, চোরা কারবার ও পুলিশের ওপর ঢিল-পাটকেল ছোড়ার বিরুদ্ধেও কঠোর হয়েছে সরকার।
পুলিশের ব্যাখ্যা
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এমন আদেশ সত্যিই দেওয়া হয়েছে, তবে তাতে নির্দিষ্টভাবে নামাজ বন্ধ করার কোনো উল্লেখ নেই। তিনি বলেন, রাস্তা আটকে যে কোনো ধর্মীয় উপাসনার ক্ষেত্রেই কঠোর হতে বলা হয়েছে পুলিশকে। দুর্গা পূজা, রমজান, ঈদ ইত্যাদির মতো বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আগে থেকে করা আবেদনের ভিত্তিতে রাস্তায় জমায়েত ও উপাসনার অনুমতি আছে, যেমনটা আগেও ছিল। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও সুষ্ঠু যানবাহন চলাচলের জন্যই এই সিদ্ধান্ত।
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
অল ইন্ডিয়া হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশনের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ আবদুল সেলিম বলেছেন, কাটা মাংস ঢেকে বিক্রি করা ও শব্দ নিয়ন্ত্রণের মতো একাধিক নির্দেশিকা সমর্থনযোগ্য। তবে অর্জুন সিংয়ের দাবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই কথাগুলো অহেতুক বলা হয়েছে। অর্জুন সিংয়ের কথায় নামাজও থামবে না বা আজানও বন্ধ হবে না। বিজেপি নেতার কথায় মুসলমান সমাজের মধ্যে কোনো রকম অস্বস্তির সৃষ্টি হবে না বলেই মনে করেন সেলিম।
অন্যান্য নির্দেশনা
একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কলকাতা বিমানবন্দরের দুই নম্বর রানওয়েতে অবস্থিত মসজিদটিকে ‘সসম্মানে’ অন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই মসজিদটি ফ্লাইট ওঠা-নামায় সমস্যা সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ করে থাকেন বিজেপির একাধিক নেতা-মন্ত্রী। গত বছর ডিসেম্বর মাসে বিজেপি আইটি সেলের প্রধান অমিত মালভিয়া দাবি করেছিলেন যে, বেসামরিক উড়ান মন্ত্রণালয়ের মতে, রানওয়ের নিকটবর্তী ওই মসজিদটি নিরাপদ বিমান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে রানওয়ের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে।
কলকাতার কয়েকটি পত্রিকায় লেখা হয়েছে যে নির্বাহী আদেশগুলোর মধ্যে মাইকের শব্দের উর্ধ্বসীমা কঠোরভাবে বলবৎ করার কথাও বলা হয়েছে। পুলিশের ওই অধিকারকর্তা জানিয়েছেন, ৬৫ ডেসিবেলের যে উর্ধ্বসীমা আছে, সব মাইকের আওয়াজ যাতে তার মধ্যেই থাকে, সেই দিকে সতর্ক নজর রাখবে পুলিশ।
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর নিরাপত্তায় যেন কোনো প্রকার অবহেলা না থাকে, সেই বিষয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া অন্য কেউ যাতে হেলমেটবিহীনভাবে বাইক না চালাতে পারে, সেই বিষয়ে সতর্ক হতে বলা হয়েছে পুলিশকে।
পশ্চিমবঙ্গে রাস্তা আটকে উপাসনার সংস্কৃতি
পশ্চিমবঙ্গে রাস্তা বন্ধ করে উপাসনার সংস্কৃতি নতুন নয়। একাধিক ধর্মীয় উৎসবে রাস্তা বন্ধ করে উপাসনা ও অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরি করার প্রবণতা রয়েছে। যে রেড রোড নিয়ে এত বিতর্ক, সেই রেড রোড প্রতি ঈদেই কার্যত একটি ঈদগাহের রূপ ধারণ করে। কলকাতা ও আশেপাশের বহু মানুষ রেড রোডে নামাজ পড়তে আসেন। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও এই রেড রোডে একাধিকবার ঈদ উপলক্ষ্যে ভাষণ দিতে উপস্থিত হয়েছিলেন। তবে এই রেড রোডের নামাজ অনুষ্ঠান মূলত সেনাবাহিনীর থেকে অনুমতি পাওয়ার পরেই করা হয়।
এ ছাড়াও দুর্গাপূজার সময়ে কলকাতার একাধিক রাস্তা আটকে যায় অস্থায়ী মণ্ডপ ও প্যান্ডেলের জেরে। কলকাতায় মোট দুর্গাপুজোর সংখ্যা ২০২৫ সালে ছিল চার হাজারের বেশি, এমনটাই জানিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর মধ্যে বহু দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল তৈরি হয় রাস্তা বন্ধ করেই। এ ছাড়াও চন্দননগর ও কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো, বাঁশবেড়িয়ার কার্তিক পুজো ও কালনার সরস্বতী পুজোর কারণেও এই শহরগুলোতে বহু রাস্তা বন্ধ করা হয় ও যান নিয়ন্ত্রণ চলে।



