চতুর্থ মেয়াদে টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র লুৎফুর রহমানের ইতিহাস
চতুর্থ মেয়াদে টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র লুৎফুর রহমান

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিবিদ লুৎফুর রহমান চতুর্থবারের মতো টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। গত ৭ মে ব্রিটেনজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচন ছিল অন্যতম। সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিরতিহীন ভোট গ্রহণ চলে। পরদিন ৮ মে শুক্রবার সকালে পূর্ব লন্ডনের এক্সেল সেন্টারে ভোট গণনা শুরু হয়।

নির্বাচনের ফলাফল

এ নির্বাচনে অ্যাস্পায়ার পার্টির প্রার্থী লুৎফুর রহমান ৩৫ হাজার ৬৭৯ ভোট পেয়ে নির্বাহী মেয়র পদে চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হন। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০ এবং ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলাম পেয়েছেন ১৯ হাজার ৪৫৪ ভোট, আর গ্রিন পার্টির হিরা খান আদেয়োগুন পেয়েছেন ১৯ হাজার ২২৩ ভোট। লেবার ও গ্রিন প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র ২৩১ ভোট।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

টাওয়ার হ্যামলেটস ঐতিহাসিক সিটি অব লন্ডনের পূর্বপাশে টেমস নদীর তীরে অবস্থিত লন্ডনের পূর্বাঞ্চল। এটি বহুদিন ধরে ব্রিটিশ রাজনীতির একটি সংবেদনশীল ও প্রতীকী এলাকা। লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় লুৎফুর রহমানের বিজয় দীর্ঘদিনের লেবার প্রভাবিত পূর্ব লন্ডনের রাজনীতিতে একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন, আবাসন, শিক্ষা, যাতায়াত, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কমিউনিটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লুৎফুর রহমানের জীবন ও রাজনৈতিক পথ

লুৎফুর রহমান ১৯৬৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সিকান্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান এবং মা মজিদুন নেসার হাত ধরে খুব অল্প বয়সে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। ইস্ট এন্ডের বৈরী পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতেই তাঁর রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। তিনি লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের স্থানীয় বো অঞ্চলের ম্যানর প্রাইমারি স্কুল, ল’ডেল জুনিয়র এবং বো স্কুলে পড়াশোনা করেন। স্কুল জীবন শেষে সিটি ইউনিভার্সিটি লন্ডন থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৯৭ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ‘ল সোসাইটির সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে সলিসিটর এবং ফ্যামিলি ল’ইয়ার হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন।

তিনি ২০০২ সালে লেবার পার্টির হয়ে স্পিটালফিল্ডস ও বাংলাটাউন ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের লিডার হন। ২০১০ সালে লেবার দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও অজানা কারণে তাকে বেশ কয়েকবার দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শেষ মুহূর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ব্রিটেনের প্রথম মুসলিম ও অশ্বেতাঙ্গ নির্বাহী মেয়র হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ২০১৫ সালে নির্বাচনী অনিয়ম সংক্রান্ত আদালতের রায়ের পর তিনি পদ হারান এবং পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন। তবে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় তদন্তকারী সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তিন দফা তদন্ত করেও কোনো প্রমাণ খুঁজে না পাওয়ার ঘোষণা দেয়। ২০২২ সালে অ্যাস্পায়ার পার্টির হয়ে তিনি আবারও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে রাজসিক প্রত্যাবর্তন ঘটান।

নির্বাচনী ইশতেহার ও অঙ্গীকার

এবারের প্রচারণায় লুৎফুর রহমানের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমানো। তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, টাওয়ার হ্যামলেটসে নিম্ন আয়ের পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যয়ে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হবে। কম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ট্রাভেল পাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কাউন্সিল শিক্ষার্থীদের জন্য Transport for London (TfL) এর নেটওয়ার্কে ব্যবহারের উপযোগী ট্রাভেল পাসের অর্থায়ন করবে। বর্তমানে লন্ডনে শুধু ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বাসে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। নতুন পরিকল্পনার আওতায় নির্ধারিত আয়সীমার নিচে থাকা পরিবারের সব শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে। আয়সীমা ও পাসের মেয়াদ TfL-এর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। যা বাস্তবায়িত হলে টাওয়ার হ্যামলেটস হবে দেশের প্রথম কাউন্সিল যারা এমন উদ্যোগ নেবে।

মেয়রের বক্তব্য

নির্বাচিত হয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, “আমাকে পুনর্নির্বাচিত করার জন্য টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণকে ধন্যবাদ। আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় যুগান্তকারী সহায়তা এবং সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন নির্মাণের রূপান্তরমূলক কর্মসূচি অব্যাহত রাখব। আশা ও ঐক্যের রাজনীতিকে ভয় ও বিভেদের রাজনীতির ওপর প্রাধান্য দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। টাওয়ার হ্যামলেটসে আমরা গর্ব করি যে এটি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ এলাকাগুলোর একটি। আমরাই দেশের প্রথম কাউন্সিল যারা সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য সার্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল চালু করেছি এবং জাতীয় সরকারের কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত উল্টে দিয়ে বাতিল করা Education Maintenance Allowance (EMA) পুনর্বহাল থেকে শুরু করে সরকারের কাটা Winter Fuel Payment ফিরিয়ে এনেছি। আমরা একসঙ্গে যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত। আমি আশা করি আজ নির্বাচিত নতুন প্রগতিশীল প্রশাসনগুলো আমাদের পথ অনুসরণ করবে, একই ধরনের রূপান্তরমূলক নীতি গ্রহণ করবে এবং আমাদের কমিউনিটির জন্য বাস্তব পরিবর্তন আনতে একসঙ্গে কাজ করবে।”

বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য গুরুত্ব

লুৎফুর রহমান কেবল একজন স্থানীয় রাজনীতিবিদ নন, তিনি ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর এই চতুর্থ দফার বিজয় টাওয়ার হ্যামলেটসের সীমানা ছাড়িয়ে ব্রিটিশ বাংলাদেশি ডায়াসপোরা এবং অভিবাসী কমিউনিটির রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আলোচনাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে। সিলেটের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে পূর্ব লন্ডনের জনজীবনে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ আজ লন্ডনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটি অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম, আত্মপ্রতিষ্ঠা এবং সম্ভাবনার এক অর্থবহ গল্প, যা এখন বাস্তবতা। তবে এই বিজয়ের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে আগামী দিনে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনে সফলতা আনায়নের মাধ্যমে। লুৎফুর রহমানের এই বিজয় শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি জনআস্থা, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং অভিবাসী কমিউনিটির রাজনৈতিক সক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।