ফরিদপুরে সংসদ সদস্যদের স্লোগান ও হট্টগোল, অনুষ্ঠান ছেড়ে গেলেন প্রতিমন্ত্রী
ফরিদপুরে সংসদ সদস্যদের স্লোগান, অনুষ্ঠান ত্যাগ প্রতিমন্ত্রীর

ফরিদপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এ সময় দুই সংসদ সদস্যের অনুসারীরা স্লোগান দিয়ে হট্টগোল করেন। পরে মাঝপথেই অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন প্রতিমন্ত্রী।

ঘটনার বিবরণ

বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুর ১২টার দিকে ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিষদের মাল্টিপারপাস হলরুমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরিদপুর অঞ্চলের কেন্দ্র উদ্বোধন উপলক্ষে আলোচনা সভায় এ ঘটনা ঘটে। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

জানা যায়, সকাল ১০টায় ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার পুরোনো বাস টার্মিনালসংলগ্ন আজিজ ম্যানশনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্র উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ ও ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে উদ্বোধনস্থলে উপস্থিত হন শামা ওবায়েদ ইসলাম। পরে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। ওই সময়ের মধ্যে দুই সংসদ সদস্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পৌঁছাননি। পরে তাঁদের অনুপস্থিতিতেই ফিতা কেটে উদ্বোধন করেন তিনি। মোনাজাত চলাকালে উপস্থিত হন সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ। উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতার শেষ পর্যায়ে আসেন অপর সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম।

তবে উদ্বোধনস্থলে শহিদুল ইসলাম পৌঁছানোর আগেই দেড় কিলোমিটার দূরে ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিষদের মাল্টিপারপাস হলরুমে আলোচনা সভায় চলে যান শামা ওবায়েদ। এরপর চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ ও শহিদুল ইসলাম বাবুল গাড়িবহর নিয়ে অন্যদিকে চলে যান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সভাস্থলে উত্তেজনা

সভাস্থলে দেখা যায়, সদর উপজেলা পরিষদের মাল্টিপারপাস হলরুমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্র উদ্বোধন উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে শামা ওবায়েদ ইসলাম উপস্থিত থাকলেও অন্য দুই বিশেষ অতিথি প্রথমে সেখানে ছিলেন না। তবে আলোচনা সভার ব্যানারে প্রধান অতিথির সঙ্গে বিশেষ অতিথি হিসেবে তাঁদের নামও উল্লেখ ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য শুরু করেন শামা ওবায়েদ। বক্তব্যের ছয় থেকে সাত মিনিটের মধ্যে চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ ও শহিদুল ইসলাম অনুসারীদের নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে হলরুমে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে মঞ্চে উঠে প্রধান অতিথির জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বসেন চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ এবং বিশেষ অতিথির চেয়ারে বসেন শহিদুল ইসলাম বাবুল।

চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ ও শামা ওবায়েদের অনুসারীরাও দুই পাশে অবস্থান নিয়ে নাম উল্লেখ করে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলামসহ পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে মঞ্চে বসে চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদকে বলতে শোনা যায়, ‘এটা ঠিক না, এটা কি?’ তাঁর সঙ্গে নেতাকর্মীরা বলতে থাকেন, ‘সদরের এমপি ছাড়া অনুষ্ঠান কেন।’ এতে দুই পক্ষের অনুসারীরা পুরো হলরুম স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন।

প্রতিমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া

বক্তব্যের ডায়াস থেকে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘এখানে কোনো রাজনীতি করতে আমি আসি নাই। এখানে আমাকে প্রধান অতিথি হিসেবে ইনভাইট করা হয়েছে। আজ যদি এখানে না আসতাম, তাহলে ঢাকায় আমার আরও কাজ ছিল। আমাকে বলা হয়েছে ১০টার সময়, আমি ১০টার মধ্যেই এসেছি। আপনাদের দলীয়করণের কারণে প্রধান অতিথিকে যদি আক্রমণ করেন, তাহলে ঠিক হবে না। কারণ, আমাকে প্রধান অতিথি হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।’

জনগণের প্রতিনিধি যদি এ ধরনের আচরণ করে তাহলে জনগণ কী শিখবে প্রশ্ন তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অনুষ্ঠান সকাল ১০টায় শুরু হবে নাকি ১০টা ১৫ মিনিটে শুরু হবে—সেটা আমার হাতে ছিল না। এখানে আমি সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে এসেছি। সুতরাং, এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা যদি মন পরিষ্কার না করে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতে না পারি, তাহলে বলে দেন—আমি আসব না। আপনার সদর থেকেও আমার নির্বাচনী এলাকায় ঢোকা হয়, কিন্তু আমি তো কখনো কিছু বলি না।’

প্রতিমন্ত্রীর প্রস্থান

অপরদিকে বক্তব্য শেষ করে মঞ্চে চেয়ার না পেয়ে টেবিলে থাকা নিজের ব্যবহৃত সামগ্রী নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হন শামা ওবায়েদ। তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এইচ এম আমান উল্লাহর চেয়ার তাঁকে বসার জন্য দেওয়া হয়। এরপর দুই সংসদ সদস্যকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান আয়োজকেরা।

একপর্যায়ে শহিদুল ইসলাম বাবুলকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য ডাকা হলে তাৎক্ষণিক চেয়ার থেকে উঠে অনুসারীদের নিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তখনও দুই পক্ষের অনুসারীরা দুই পাশে অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেন। এ সময় হলরুমে উপস্থিত থাকা অধিকাংশ শিক্ষকও বের হয়ে যান এবং তাঁদের চেয়ারে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা বসে পড়েন।

সংসদ সদস্যদের বক্তব্য

পরে বক্তব্যকালে এ ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেন শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি খুবই দুঃখিত যে এখানে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটল। এটা কাকতালীয় না। আসলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্র উদ্বোধনের কথা ছিল সকাল ১০টায়। ফরিদপুর সদরের এমপি চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ আমাকে জানানোর পরে হয়তো আমাদের দুই থেকে তিন মিনিট দেরি হয়েছিল। এ জন্য এখানে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।’

তাঁর বক্তব্য শেষে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ। বক্তব্যকালে তিনি বলেন, ‘বাবুল ভাইয়ের বক্তব্যের পরে আমার বক্তব্য বেমানান হয়ে যায়।’

এ ছাড়া ফরিদপুরে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর পরিবারের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ফরিদপুরে আমাদের পরিবারের পরিচয় একদিনের না, ফরিদপুর সদরে আমাদের দেড়শ বছরের অবদান। আমরা শিক্ষার ব্যাপারে কোনো দিনও রাজনীতি করিনি। আমরা রাজনীতির পরিবার, রাজনীতি আমরা করবই।’