যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধ এবং বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক সইয়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে হোয়াইট হাউস মনে করছে। বুধবার (৬ মে) দুজন মার্কিন কর্মকর্তা ও বিষয়টির সঙ্গে জড়িত আরও দুটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে তেহরানের অবস্থান জানতে চায় ওয়াশিংটন। যদিও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি, তবু সংশ্লিষ্টদের মতে সংঘাত শুরুর পর এই প্রথম দুই পক্ষ এতটা কাছাকাছি এসেছে।
প্রস্তাবিত খসড়ার মূল বিষয়বস্তু
প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, ইরান সাময়িকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখবে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিপুল অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ নেবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধও তুলে নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই সমঝোতার অনেক শর্তই ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুদ্ধ আপাতত থামলেও দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা থেকেই যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
আলোচনার পথে বাধা
হোয়াইট হাউসের ধারণা, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান বিভক্ত থাকায় যেকোনো চুক্তিতে ঐকমত্যে পৌঁছানো সহজ হবে না। এমনকি প্রাথমিক সমঝোতাও ভেস্তে যেতে পারে বলে কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন। এর আগে একাধিকবার আলোচনা এগোলেও শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সাম্প্রতিক অগ্রগতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে আপাতত সরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
দর-কষাকষি ও সময়সীমা
জানা গেছে, ১৪ দফা প্রস্তাবনা নিয়ে দর-কষাকষি চলছে। উভয় পক্ষ সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রথমে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হবে, এরপর ৩০ দিনের নিবিড় আলোচনা চলবে। এই সময়ে পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সমুদ্রপথ উন্মুক্ত করার বিষয়ে বিস্তারিত সমঝোতা চূড়ান্ত করার চেষ্টা হবে। আলোচনার স্থান হিসেবে ইসলামাবাদ বা জেনেভার নাম উঠে এসেছে। এই সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষ ধাপে ধাপে সামরিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও অবরোধ বা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে বিতর্ক
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখার সময়সীমা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতা চাইছে, আর ইরান তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি প্রস্তাব দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই সময়সীমা এক দশকের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং এ ধরনের কোনো কার্যক্রমে জড়াবে না। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য উন্মুক্ত পরিদর্শনের ব্যবস্থাও থাকতে পারে, যাতে যেকোনো সময় ইরানের স্থাপনাগুলো পরীক্ষা করা যায়। এ ছাড়া উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে, যা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম দাবি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ও শর্ত
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পাশাপাশি ইরানের অর্থনৈতিক প্রবাহ স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। ইরানের সাথে সম্ভাব্য চুক্তি প্রসঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানান যে, এ ধরনের কোনো চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। বিষয়টিকে অত্যন্ত জটিল ও কৌশলগত উল্লেখ করে তিনি একটি স্বচ্ছ কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন। রুবিও আরও বলেন, আলোচনার কার্যকারিতা নির্ভর করছে শুরুতেই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত, তার ওপর। তবে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশকে 'উন্মাদ' আখ্যা দিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন যে, তারা আদৌ কোনো ফলপ্রসূ চুক্তিতে পৌঁছাতে ইচ্ছুক কি না।
সূত্র: এক্সিওস



