ইরান যুদ্ধে কংগ্রেসের নীরবতা: ট্রাম্পের চ্যালেঞ্জ ও রিপাবলিকানদের দ্বিধা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে রিপাবলিকান পার্টির অনেক নেতাই অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। এই ইস্যুতে কংগ্রেসে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা ১ মে সময়সীমা নির্ধারণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়সীমা পার হয়ে যাচ্ছে, এবং এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং, রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এই যুদ্ধ ইস্যুতে সব সিদ্ধান্ত হোয়াইট হাউসের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছেন। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশনের সময়সীমা ও বর্তমান অবস্থা
১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী কোনো সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি কংগ্রেসকে জানানোর পর প্রেসিডেন্ট ৬০ দিন সময় পান। এই সময়ের মধ্যে হয় অভিযান শেষ করতে হবে, নয়তো কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। তবে বাহিনী নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য হোয়াইট হাউস অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় নিতে পারে, যার জন্য কংগ্রেসকে অবহিত করতে হয়। সেই নিয়ম অনুযায়ী, সময়সীমা শেষ হচ্ছে শুক্রবার। কিন্তু কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই নিয়ম কার্যকরের কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। উল্টো, ইরান যুদ্ধ বন্ধে ডেমোক্র্যাটদের আনা ষষ্ঠবারের প্রচেষ্টা সিনেটে নাকচ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার এক সপ্তাহের ছুটিতে গেছেন আইনপ্রণেতারা।
ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহই দেখাচ্ছে না। তাদের যুক্তি, গত এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর ইরান যুদ্ধ কার্যত শেষ হয়ে গেছে। ফলে এই আইনের সময়সীমা এখন আর প্রযোজ্য নয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার এক শুনানিতে বলেন, ‘আমরা এখন একটি যুদ্ধবিরতির মধ্যে রয়েছি। আমাদের বোঝাপড়া অনুযায়ী, এর অর্থ হলো এই ৬০ দিনের ঘড়ি এখন থমকে গেছে বা বন্ধ রয়েছে।’
রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভক্তি ও দ্বিধা
সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ও সাউথ ডাকোটার রিপাবলিকান প্রতিনিধি জন থুন বৃহস্পতিবার জানান, ইরানে সামরিক শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন বা এ নিয়ে অন্য কোনো ভোটাভুটির পরিকল্পনা তার নেই। তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের দলীয় সদস্যদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনছি। এই মুহূর্তে আমি তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।’
যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের এই অনীহা তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সাধারণ মানুষের মধ্যে এই যুদ্ধ এবং এর কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। তা সত্ত্বেও বেশির ভাগ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা বলছেন, যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। অথবা এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে তারা প্রেসিডেন্টকে আরও কিছুটা সময় দিতে চান।
নর্থ ডাকোটার রিপাবলিকান সিনেটর কেভিন ক্রেমার বলেন, ট্রাম্প চাইলে তিনি যুদ্ধের অনুমোদনের পক্ষে ভোট দেবেন। তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় কংগ্রেসের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য পাস হওয়া ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ আইনটি আদৌ সাংবিধানিক কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। ক্রেমার বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠাতারা একজন শক্তিশালী নির্বাহী প্রধান তৈরি করেছেন, তা মানুষ পছন্দ করুক আর না-ই করুক।’
অবশ্য কিছু রিপাবলিকান সিনেটর স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা চান এ বিষয়ে কংগ্রেসেরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকুক। আলাস্কার সিনেটর লিসা মুরকোস্কি বৃহস্পতিবার ফ্লোরে দেওয়া এক বক্তৃতায় বলেন, সিনেট এক সপ্তাহের ছুটি থেকে ফেরার পর প্রশাসন যদি কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা’ পেশ না করে, তবে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহারের ওপর একটি সীমিত অনুমোদনের প্রস্তাব পেশ করবেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে, স্পষ্ট জবাবদিহি ছাড়া আমাদের এভাবে অনির্দিষ্টকালের সামরিক অভিযানে লিপ্ত থাকা উচিত। এখানে কংগ্রেসের ভূমিকা রয়েছে।’
কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বলছেন যে, কোনো একপর্যায়ে কংগ্রেসের উচিত এই যুদ্ধের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাদের মধ্যে মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্স বৃহস্পতিবার এই প্রথমবারের মতো যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, তিনি এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল দেখতে চান। কলিন্স আরও বলেন, ‘কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমাহীন নয়। ৬০ দিনের সময়সীমা কোনো পরামর্শ নয়, এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা।’
কলিন্স ও মুরকোস্কি ছাড়াও উটাহর জন কার্টিস, নর্থ ক্যারোলাইনার থম টিলিস এবং মিসৌরির জশ হাওলেসহ অন্য কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর গত কয়েক সপ্তাহে বলেছেন যে, তারা এ বিষয়ে একটি ভোট চান। কার্টিস জানান, কংগ্রেসের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত তিনি এই যুদ্ধের জন্য তহবিল অব্যাহত রাখাকে সমর্থন করবেন না। তিনি বলেন, ‘এখন প্রশাসন ও কংগ্রেস উভয়েরই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে এবং তা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে হওয়া উচিত, দ্বন্দ্বে জড়িয়ে নয়।’
অন্যদিকে জন থুন পরামর্শ দিয়েছেন যে, ক্যাপিটল হিলের সমর্থন ধরে রাখতে চাইলে হোয়াইট হাউসের উচিত ব্রিফিং ও শুনানির মাধ্যমে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত বিরতিতে আমাদের সামরিক নেতৃত্বের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেলে তা দলীয় সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সহায়ক হবে। সেখানে আসলে কী ঘটছে এবং পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে তারা কতটা স্বস্তিতে আছেন, সেটি বুঝতে সুবিধা হবে।’
প্রশাসনের যুক্তি ও ডেমোক্র্যাটদের প্রতিক্রিয়া
প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা এখন সমাপ্ত হয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানান, গত ৭ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং ইরানের মধ্যে আর কোনো গোলাগুলি হয়নি। যদিও ইরান এখনও হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের তেল ট্যাঙ্কারগুলোকে সাগরে যেতে বাধা দিতে সেখানে অবরোধ জারি রেখেছে, তবুও ট্রাম্প প্রশাসন এই যুক্তি দিয়ে যাচ্ছে।
১ মে চূড়ান্ত সময়সীমা নয়, প্রশাসনের এমন দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। শুনানিতে ভার্জিনিয়ার সিনেটর টিম কেইন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথকে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে আইনটি এই যুক্তিকে সমর্থন করে।’ ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যাডাম শিফ যুক্তি দেন যে, যুদ্ধবিরতির সময় ইরানে বোমা বর্ষণ বন্ধ থাকলেও সামরিক বাহিনী এখনও যুদ্ধজাহাজ এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। শিফ বলেন, ‘কিছু বাহিনী ব্যবহার বন্ধ রেখে অন্যগুলো সচল রাখার মাধ্যমে সময়সীমার ঘড়ি বন্ধ করা যায় না।’
তবে সামরিক খাত তদারককারী অন্তত একজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার কাছে এই পরিস্থিতি খুব একটা বিস্ময়কর মনে হয়নি। হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য অ্যাডাম স্মিথ বলেন, ‘আমাদের কি প্রত্যাশা করা উচিত যে ট্রাম্প প্রশাসন আইন মেনে চলবে? আমার অন্তত সেই প্রত্যাশা নেই।’



