বুধবার শেষ হওয়া পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে সর্বকালের সর্বোচ্চ ভোট পড়ার নতুন রেকর্ড গড়েছে। এই বিশাল ভোটদানের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রবণতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে নারী ভোটারদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ। ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ও লোকসভা উভয় নির্বাচনেই পুরুষদের তুলনায় নারী ভোটারদের উপস্থিতির হার ধারাবাহিকভাবে বেশি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ খবর জানিয়েছে।
ভোটদানের রেকর্ড ও লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণ
ভারতের নির্বাচন কমিশনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে সামগ্রিক ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ। এটি এ যাবৎকালের যেকোনও বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোটদানের রেকর্ড। এর মধ্যে নারী ভোটারদের উপস্থিতির হার ছিল ৯৩.২৪ শতাংশ, আর পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৯১.৭৪ শতাংশ।
এর আগে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৮৪.৭২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। সেবার নারী ভোটারদের হার ছিল ৮৪.৪৫ শতাংশ এবং পুরুষদের হার ছিল ৮৪.২২ শতাংশ। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ক্ষমতায় আসে এবং পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে।
গত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনামূলক চিত্র
অবশ্য ২০১১ সালের পর কেবল ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেই এই ধারার ব্যতিক্রম দেখা গিয়েছিল। সেবার সামগ্রিক ভোট ৮২.২২ শতাংশ হলেও নারীদের ভোটদানের হার (৮১.৯৬ শতাংশ) পুরুষদের (৮২.১৯ শতাংশ) চেয়ে সামান্য কম ছিল। এর পর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সামগ্রিক ৮৩.০২ শতাংশ ভোটের মধ্যে নারীদের হার ছিল ৮৩.১৩ শতাংশ এবং পুরুষদের ৮২.২৩ শতাংশ।
২০১৯ সালের লোকসভায় মোট ৮১.৭৬ শতাংশ ভোটের মধ্যে ৮১.৭৯ শতাংশ নারী এবং ৮১.৩৫ শতাংশ পুরুষ ভোট দেন। ২০২১ সালের বিধানসভায় সামগ্রিক ৮২.৩ শতাংশ ভোটের মধ্যে নারীদের হার ছিল ৮১.৭৫ শতাংশ এবং পুরুষদের ৮১.৩৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই ব্যবধান আরও বাড়ে; সেবার সামগ্রিক ৭৯.৫৫ শতাংশ ভোটের মধ্যে নারীদের ভোটদানের হার ছিল ৮০.১৬ শতাংশ, আর পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৭৮.২ শতাংশ।
চলতি বিধানসভা নির্বাচনের দুই দফাতেই ভোটকেন্দ্রগুলোতে নারী ও পুরুষ ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
মমতা ও নারী কেন্দ্রিক রাজনীতি
২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টানা জয়ের পেছনে নারী ভোটাররা বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার টানা তিন মেয়াদে নারীদের একটি স্বতন্ত্র ভোটব্যাংক হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এ জন্য তিনি নারীদের জন্য আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন কল্যাণমুখী প্রকল্প চালু করেন।
প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর তিনি মেয়েদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প চালু করেন। এরপর মেয়েদের বিয়ের জন্য অভিভাবকদের ২৫ হাজার টাকা অনুদান দেওয়ার ‘রূপশ্রী’ প্রকল্প চালু করা হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালে মমতা চালু করেন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় শুরুতে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে।
তবে নারীদের এই ক্রমবর্ধমান ভোটদানের হার কেবল পশ্চিমবঙ্গের একক চিত্র নয়। ভারতের বিগত কয়েকটি লোকসভা নির্বাচনে দেখা গেছে, সামগ্রিক ভোটার তালিকায় নারীদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছেন। ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট ভোটারের মধ্যে নারীদের অংশীদারত্ব ২০০৯ সালের ৪৭.৭৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ৪৮.০৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান ও ভিন্ন মত
পশ্চিমবঙ্গের লিঙ্গভিত্তিক ভোটের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৬২ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত নারীদের ভোটদানের হার সবসময় পুরুষদের চেয়ে কম ছিল। ১৯৬২ সালে মোট ভোট পড়েছিল ৫৫ শতাংশ; যেখানে পুরুষ ভোটার ছিলেন ৬১.৭৭ শতাংশ এবং নারী ভোটার ছিলেন ৪৭.৪৩ শতাংশ। তবে ২০০৯ সালে মোট ভোট বেড়ে ৮১.৪২ শতাংশে পৌঁছালে নারীদের হার (৮০.২৫ শতাংশ) পুরুষদের হারের (৮২.২৯ শতাংশ) প্রায় কাছাকাছি চলে আসে।
এই ক্রমবর্ধমান নারী ভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ ও মন্তব্য। সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেন, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ১৯৭৮ সাল থেকে পঞ্চায়েতে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ শুরু হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ে এবং তারা সমান অধিকার নিয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
তবে ২০১১ সালের পর নারীদের ভোট বেশি পড়ার পেছনে তিনি পুরুষদের ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া বা পরিযায়ী হওয়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থান না থাকায় প্রচুর যুবক কাজের জন্য অন্য রাজ্যে চলে গেছেন। প্রতি নির্বাচনেই পুরুষদের একটি অংশ ভোট দিতে আসতে পারেন না, তবে নারীরা ভোট দেন। অবশ্য এবার ভোট দিতে ঘরে ফেরার তোড়জোড় দেখা গেছে।
তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ভারতের হিন্দি বলয় থেকে আসা মানুষ এই নারী ভোটারদের কারণে পশ্চিমবঙ্গে কখনোই জিততে পারবে না। কারণ, এই রাজ্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায়ের আমল থেকেই নারী ক্ষমতায়নের কথা বলে এসেছে। এ কারণেই বিজেপি নেতৃত্ব বাংলায় নারীদের ভোট দেওয়া বন্ধ করা প্রয়োজন বলে মনে করেছিল। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)-এর পর মুসলিমদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক নারী ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিনহা সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে নারীরা সবচেয়ে বেশি অপমানিত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তৃণমূলের আমলে নারীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, এই নির্বাচনে নারীরা তৃণমূলের বিরুদ্ধেই ভোট দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন।



