বিশ্বশান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের উত্থান
পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নতুন ভূমিকা গড়ে তুলতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নিতে চাইছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইসলামাবাদ ইতিমধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করেছে এবং দুই পক্ষকে এক টেবিলে আনার চেষ্টা করছে।
কূটনৈতিক আলোচনা ও শান্তি প্রক্রিয়া
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের তেহরান সফর কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিয়েছে। তাঁর এই সফর লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ রাখতে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরান কিছু সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছিল, যদিও পরে তা আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এই আলোচনায় সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। পাকিস্তানের ধারণা, একটি চুক্তি হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদে এসে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন।
পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান ও সুবিধা
পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্ব ধরে রেখেছে। এই অবস্থান ব্যবহার করেই তারা ইরানকে আলোচনায় আনার ব্যাপারে চীনের কাছ থেকে আশ্বাস আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত জামির আকরাম বলেন, ‘এখন পাকিস্তানের কাজ হলো দুই পক্ষকে এমনভাবে আস্থা দেওয়া, যেন তারা মনে করে, তারা একটি সম্মানজনক সমাধান নিয়ে বের হতে পারবে।’ তবে এই উচ্চপর্যায়ের কূটনীতির মধ্যেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্বলতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
পাকিস্তান ব্যয় কমাতে দেশজুড়ে দৈনিক বিদ্যুৎ–বিভ্রাট চালাচ্ছে এবং সৌদি আরব থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ নিতে হয়েছে। তবুও ইসলামাবাদ আশা করছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। এর জন্য অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন হবে, যেমন করহার কমানো এবং আইনকানুন আরও শক্তিশালী করা।
হোয়াইট হাউসের সাবেক কর্মকর্তা জশুয়া হোয়াইট বলেন, ‘বর্তমানে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজস্ব ধারণা ও প্রবণতা বড় ভূমিকা রাখে। এই সুযোগকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে পাকিস্তানের নেতৃত্ব।’
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সতর্কতা
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড মনে করেন, পাকিস্তান আলোচনার ফলাফল নিয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা না করলে এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই বৈঠক আয়োজন করতে পারলেই কেবল দুই পক্ষকে এক টেবিলে আনার সুযোগ তৈরি করেই তারা লাভবান হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের হারানোর কিছু নেই।’
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উদ্যোগের সূচনা ঘটে মূলত গত বছর ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একজন মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন থেকে। ২০২৫ সালের জুনে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে আকস্মিক বৈঠকের পর পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এ দায়িত্ব নিয়েছিলেন।



