চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়ায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের আলোচিত ঘটনায় করা মামলায় অভিযুক্ত মনির হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। ঘটনার ১৩ দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ।
ঘটনার বিবরণ
এই শিশু ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২১ মে বিকাল ৫টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয় চেয়ারম্যান ঘাটা আবু জাফর রোড এলাকা। শত শত লোক অভিযুক্ত যুবককে নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে সড়কে অবস্থান নেয়, পুলিশের গাড়ি আটকে দেয় এবং পরে একটি পুলিশ ভ্যানে আগুন দেয়। টানা ছয় ঘণ্টা একটি ভবনে অবরুদ্ধ রাখার পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ করে অভিযুক্তকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে কৌশলে বাকলিয়া থানায় নেওয়া হয়। ওই দিন সংবাদ লাইভ করতে গিয়ে পুলিশের ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে আহত হন চট্টগ্রাম প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসান।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকায় এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর বিকালে তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে স্বজন ও স্থানীয়দের সন্দেহ হয়, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। পরে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিকাল ৫টার দিকে বিক্ষুব্ধ লোকজন রাস্তায় নেমে আসেন। অভিযুক্ত যুবকের নাম মনির হোসেন। সে স্থানীয় একটি ডেকোরেশন দোকানে কাজ করে। ঘটনার পর স্থানীয়রা অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করে ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ নামের একটি ভবন অবরুদ্ধ করে রাখে। একপর্যায়ে তারা ভবনটির কলাপসিবল গেট ভেঙে ফেলারও চেষ্টা করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। অন্যদিকে অভিযুক্তকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা পথ আটকে দেয় এবং তাকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। এ সময় উপস্থিত লোকজন চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘বাংলাদেশে বিচার নেই। ধর্ষকাকে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরাই তার বিচার করবো।’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। স্থানীয়দের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে রাত সাড়ে ১০টার পর এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময় অভিযুক্তকে ভবন থেকে বের করে পুলিশের পোশাক পরিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ের মধ্য দিয়েই বাকলিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের বক্তব্য
বিষয়টি নিশ্চিত করে ওই দিন বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেছিলেন, স্থানীয় লোকজনের হাত থেকে বাঁচাতে পুলিশের পোশাক পরিয়ে অভিযুক্তকে থানায় আনা হয়েছে। অভিযুক্তকে থানায় নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে স্থানীয়রা। তারা পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি অতিরিক্ত এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়। রাত ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ জনতার একটি দল থানা ঘেরাও করতে মূল সড়কে পৌঁছে যায়। এ সময় কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালানোর ঘটনাও ঘটে। পরে অভিযুক্ত মনির হোসেনের বিরুদ্ধে পরদিন শুক্রবার শিশুটির বাবা বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় মামলাটি করেন। ওই দিন বিকালে আদালতে হাজির করা হলে আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ভুক্তভোগীর অবস্থা
ভুক্তভোগী শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন ছিল ছয় দিন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সুস্থ হওয়ার পর বাড়ি ফিরে গেছে শিশুটি।
অভিযোগপত্র দাখিল
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘চার বছরের সেই শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মনির হোসেনকে একমাত্র অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এটি এখন ডকেট শাখা থেকে ষষ্ঠ আমলি আদালতে পাঠানো হবে।’ বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, ‘বাকলিয়ার আলোচিত শিশু ধর্ষণ মামলায় তদন্ত শেষ করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও প্রতিবেদন সংগ্রহের পর অভিযোগপত্র আজ বৃহস্পতিবার আদালতে দাখিল করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ, মেডিক্যাল রিপোর্ট ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।’ ওসি বলেন, ‘সাত কার্যদিবসের মধ্যে এ অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এ ঘটনায় গত ২২ মে বাকলিয়া থানায় মামলা করা হয়েছিল। ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সরকারি বন্ধ ছিল। আজ বৃহস্পতিবার আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।’



