ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে তেহরানের কোনো আলোচনা বা সংলাপ চলছে না। ইরানের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পরমাণু আলোচনা প্রসঙ্গে ইরানের অবস্থান
আজিজি জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন যে পরমাণু ক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের সঙ্গে এই মুহূর্তে কোনো আলোচনা চলছে না এবং ইরান যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টিকেও তেহরান বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাত দিয়ে আজিজি আরও জানান, ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নতুন কৌশলগত পদ্ধতি তৈরি করছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরবে না এবং বৈরী রাষ্ট্রগুলোর কোনো যুদ্ধজাহাজ বা নৌযানকে এর মধ্য দিয়ে পার হতে দেওয়া হবে না।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
তিনি উল্লেখ করেন, শত্রুপক্ষ ভেবেছিল ইরান হয়তো দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু ইসলামিক রিপাবলিক দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে অবিচলভাবে দাঁড়িয়েছে, যাদের একটির রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক বাহিনী। এর আগে কেউই কল্পনা করতে পারেনি যে ইরান এ অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানবে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে উল্লেখ করে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধের আগে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর নির্ভরশীল মনে করা হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘাঁটিগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে উল্টো নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
মার্কিন উপস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব
চলতি যুদ্ধে যে দেশগুলো মার্কিন ঘাঁটিকে আশ্রয় দেয়নি, তারা নিরাপদ থেকেছে। পক্ষান্তরে মার্কিন ঘাঁটির আমন্ত্রক দেশগুলো সুরক্ষিত থাকতে পারেনি। এটি প্রমাণ করে যে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কেবলই নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয় এবং ওয়াশিংটন শুধুমাত্র ইহুদিবাদী ইসরাইলি শাসনকে রক্ষা করতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪ ও যুদ্ধবিরতি
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ইসরাইলি বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪ নামক একটি বিশাল প্রতিশোধমূলক পাল্টা অভিযান চালায়। প্রায় ১০০ তরঙ্গের এই অভিযানে শত শত ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক মিসাইল এবং ড্রোন দিয়ে পুরো অঞ্চলের কৌশলগত মার্কিন ও ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানা হয়।
যুদ্ধের ৪০তম দিনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ইসলামাবাদে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। তবে মার্কিন প্রতিনিধি দলের অতিরিক্ত দাবি এবং বারবার অবস্থান পরিবর্তনের কারণে সেই আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেস্তে যায়।
ইরানের শর্ত ও নিষেধাজ্ঞা
ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে ইরান চূড়ান্তভাবে নতুন কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তেহরানের সাফ কথা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আগে ইরানি জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবৈধ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। তারা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যতক্ষণ পর্যন্ত এই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা ইরানের নেই।
তবে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবরোধ তেহরানের তেল রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ের পথ বন্ধ করার যে মূল লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছিল, তা অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।



