ইথিওপিয়ায় আগামীকাল সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, কিন্তু দেশের বিভিন্ন অংশে চলমান সংঘাতের কারণে অনেক নাগরিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, তবে উত্তরের টাইগ্রে অঞ্চলটি সম্পূর্ণভাবে নির্বাচনের বাইরে থাকবে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে। টাইগ্রে অঞ্চলটি ২০২২ সালে শেষ হওয়া ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ থেকে এখনও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
নির্বাচনের পটভূমি
এটি ১৯৯১ সালে সামরিক শাসনের পতনের পর ইথিওপিয়ার সপ্তম সাধারণ নির্বাচন। ওই পরিবর্তনের ফলে দুই বছর পর ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়। বর্তমানে ইথিওপিয়া ও তার উত্তরের প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক আবারও উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে।
নির্বাচন প্রক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ সরাসরি নির্বাচিত হন না। ভোটাররা ৫৪৭ সদস্যের পার্লামেন্টে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। যে দল কমপক্ষে ২৭৪ আসন পায়, তারা সরকার গঠন করে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনা করে।
আবি আহমেদের উত্থান ও সমালোচনা
৪৯ বছর বয়সী আবি ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসেন, যখন তিনি ইথিওপিয়ান পিপলস রেভল্যুশনারি ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের বিরুদ্ধে ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এই জোটটি ১৯৯১ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিল এবং মূলত টাইগ্রে অঞ্চলের রাজনীতিকদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। পরে তিনি ইথিওপিয়ান পিপলস রেভল্যুশনারি বিলুপ্ত করে নিজের ‘প্রোসপারিটি পার্টি’ গঠন করেন, যা আগের তুলনায় বেশি কেন্দ্রিক এবং কম ফেডারেল শাসন কাঠামোর দিকে ঝোঁকে।
বিরোধীদের অভিযোগ
বিরোধীরা অভিযোগ করেন, আবির সরকার মতপ্রকাশ দমন করছে, বিরোধীদের নির্বাসনে যেতে বাধ্য করছে এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের গ্রেফতার করছে। তার শাসনামলে ২০২০ সালে টাইগ্রে অঞ্চলে দুই বছরের যুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যস্থতাকারীর মতে প্রায় ৬ লাখ মানুষ মারা যায় এবং অঞ্চলটি দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর ২০২৫ সালের সূচকে ইথিওপিয়া ১৮০ দেশের মধ্যে ১৪৮তম স্থানে রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, সরকার সাংবাদিকদের অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করছে এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর হয়রানি চালাচ্ছে। রয়টার্সের তিন সাংবাদিকের অনুমোদন বাতিল করার পর কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক ও স্বাধীন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দমনমূলক প্রবণতার একটি উদ্বেগজনক ধারা।
সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি
সমর্থকরা বলছেন, আবি দেশকে উন্নত করেছেন। রাজধানী আদ্দিস আবাবা দ্রুত আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা ‘করিডর ডেভেলপমেন্ট’ ও ‘রিভারসাইড’ প্রকল্পের অংশ। তবে এসব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অনেক মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে সমালোচনাও রয়েছে।
ইথিওপিয়ার অর্থনীতি বাড়ছে, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক তার অর্থনৈতিক সংস্কারকে সমর্থন দিয়েছে, তবে শর্ত দিয়েছে—দেশকে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার উন্মুক্ত করতে হবে এবং ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ২০২৪ সালে দেশের মোট ঋণ ছিল ৩৬.৫ বিলিয়ন ডলার।
ইথিওপিয়ার জনসংখ্যা ১৩৫.৯ মিলিয়ন—আফ্রিকায় দ্বিতীয় বৃহত্তম। এটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোর একটি। তবে নিরাপত্তাহীনতা, মূল্যস্ফীতি এবং যুদ্ধ-পরবর্তী প্রভাব দেশটিকে চাপে রেখেছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি
টাইগ্রের পাশাপাশি আমহারা ও ওরোমিয়া অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত চলছে। আমহারা অঞ্চলের ফানো মিলিশিয়া এবং ওরোমো লিবারেশন আর্মি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দুই গোষ্ঠীই বেশি স্বায়ত্তশাসন চায়। আমহারা মিলিশিয়া মনে করে সরকার তাদের দুর্বল করতে চায়। ওরোমো গোষ্ঠী মনে করে তারা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। ২০২৪ সালে এসব সংঘাতে প্রায় ৯,৪০০ জন নিহত হয়েছে।
সরকার বলছে, আমহারা ও ওরোমিয়ার ৯৭% এলাকা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তবে বিরোধীরা তা মানছে না।
টাইগ্রেতে পরিস্থিতি
টাইগ্রে অঞ্চলে প্রায় ৬ মিলিয়ন মানুষ বাস করে। ২০২২ সালের শান্তিচুক্তির পর সেখানে অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠিত হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি রাজনৈতিক উত্তেজনা আবার বেড়েছে। টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে।
ভোটারদের প্রত্যাশা
৫ কোটি ৫ লাখের বেশি মানুষ ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছে। অনেক তরুণ ভোটার আশা করছে, নির্বাচন স্থিতিশীলতা আনবে। একজন তরুণ ভোটার বিবিসিকে বলেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা হলে তার শিক্ষা ও জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০২১ সালের নির্বাচনে আবির দল বিপুল বিজয় পেয়েছিল। সরকার বলছে, এবার তারা সব আসন জিততে চায় না, বরং বিরোধীদেরও সুযোগ দিতে চায়।



