ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) একটি গোপন গ্রেফতারি পরোয়ানার আবেদন জমা পড়েছে। গত মাসে আদালতের প্রসিকিউটরের কার্যালয় এই আবেদনটি দায়ের করে। এ বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্র মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
অভিযোগের বিবরণ
স্মোটরিচের বিরুদ্ধে মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ও অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা, যুদ্ধাপরাধ হিসেবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলিদের স্থানান্তর করা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন ও বর্ণবাদ চাপিয়ে দেওয়া। আইসিসির প্রাক-বিচারিক আদালত যদি এই আবেদন অনুমোদন করে, তবে আন্তর্জাতিক আদালতের ইতিহাসে বর্ণবাদের অপরাধে জারি হওয়া এটি হবে প্রথম গ্রেফতারি পরোয়ানা।
আবেদনের সময়কাল ও প্রেক্ষাপট
গত ২ এপ্রিল এই আবেদনটি ফাইল করা হয়। এর আগে ফিলিস্তিনি মিশন স্মোটরিচ ও ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইসিসির কাছে বারবার দাবি জানিয়ে আসছিল। গত মার্চে আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ফিলিস্তিনি মিশন ইসরায়েলি সেটেলার এবং দখলদার বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের নতুন তথ্যপ্রমাণ জমা দেয় এবং উল্লেখ করে যে ইসরায়েল এই অপরাধগুলোর বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে গত সপ্তাহে দাবি করা হয়েছিল যে, আইসিসির প্রসিকিউটর কার্যালয় পাঁচজন ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আবেদন করেছে। তবে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, ওই খবরটি সঠিক নয়। মূলত স্মোটরিচের বিরুদ্ধে আবেদনটি ইতোমধ্যে জমা পড়েছে। আর গত বুধবার এক তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনার বৈঠকে ইতামার বেন গভিরসহ আরও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরোয়ানার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হলেও তা এখনও ফাইল করা হয়নি।
আইসিসির প্রতিক্রিয়া
স্মোটরিচের বিরুদ্ধে আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রসিকিউটর কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র তা অস্বীকার করেননি। তিনি আদালতের সংশোধিত নিয়মের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিচারকদের অনুমতি ছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানার আবেদনগুলো গোপন বা সিলগালা অবস্থায় রাখতে হয়। তাই এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে আইসিসির মুখপাত্র ওরিয়ান মেইলেত বলেছেন, আদালত ফিলিস্তিন পরিস্থিতির বিপরীতে নতুন কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি অস্বীকার করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বক্তব্য আইসিসির নিজস্ব নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মূলত বর্তমানে আইসিসির কৌশল হলো এই সংক্রান্ত খবর নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটি না করা।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও প্রভাব
বিচারকেরা যদি এই পরোয়ানা অনুমোদন করেন, তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের পর স্মোটরিচ হবেন আইসিসি কর্তৃক ওয়ান্টেড তৃতীয় ইসরায়েলি কর্মকর্তা। নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির পর থেকেই আইসিসির ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নজিরবিহীন হুমকি ও নিষেধাজ্ঞা নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান, তার দুই ডেপুটি, আটজন বিচারক এবং জাতিসংঘের বিশেষ নারী র্যাপোর্টিয়ারের ওপর আর্থিক ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এমনকি নেতানিয়াহুর পরোয়ানায় স্বাক্ষরকারী বিচারক রেইন অ্যালাপিনি-গানসু (বেনিন), বেটি হোহলার (স্লোভেনিয়া) এবং নিকোলাস গুইলোর (ফ্রান্স) ওপরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এর বাইরে পুরো আদালতের ওপরই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকি রয়েছে। এর আগে জানা গিয়েছিল, করিম খান ছুটিতে যাওয়ার আগেই স্মোটরিচ ও বেন গভিরের বিরুদ্ধে পরোয়ানার আবেদন প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে তার ডেপুটিরা তা ফাইল করতে দেরি করেন।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন ও উচ্ছেদের পক্ষে উসকানিমূলক মন্তব্য করার অপরাধে গত বছরের জুন থেকে স্মোটরিচ ও বেন গভিরের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা চলছে। আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হিসেবে গণ্য পশ্চিম তীরের বসতিতে বসবাসকারী এই দুই মন্ত্রী গাজায় পুনরায় ইসরায়েলি বসতি চালুর পক্ষে ওকালতি করে আসছেন।
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং নরওয়ে যৌথভাবে এই দুই মন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাদের সম্পদ ফ্রিজ করে এবং প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাজ্যের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ল্যামি বলেছিলেন, এই দুই মন্ত্রী চরমপন্থি সহিংসতায় উসকানি দিয়েছেন। পরে জুলাইয়ে স্লোভেনিয়া প্রথম ইইউ দেশ হিসেবে তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও স্পেনও তাদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে ডাচদের নিষেধাজ্ঞাটি ২৯টি দেশের পুরো শেনজেন অঞ্চলের জন্য কার্যকর।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) স্তরেও তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার একটি প্রস্তাব গত সেপ্টেম্বর থেকে আলোচনায় রয়েছে। তবে গত ১১ মে ইইউ-এর পররাষ্ট্র কাউন্সিল হামাস নেতা ও সহিংস সেটলারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও এই দুই মন্ত্রীর নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়। জার্মানি, ইতালি, অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র এবং হাঙ্গেরির বিরোধিতার কারণে ইইউ এই দুই মন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে ব্যর্থ হয়।



