কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে উল্লাস: নৈতিক অবক্ষয়ের প্রকাশ
কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে উল্লাস: নৈতিক অবক্ষয়

কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার আর নেই। চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তিনি চলে গেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এই তরুণীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তে না পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় এক অগ্রহণযোগ্য প্রতিক্রিয়া।

উল্লাস ও কুৎসিত মন্তব্য

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাংশের কর্মী-সমর্থকেরা কারিনা কায়সারের মৃত্যুতে উল্লাস প্রকাশ করছেন এবং তাঁর মরদেহ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করছেন। এটি শুধু একজন মৃত মানুষের প্রতি অসম্মান নয়, বরং সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি।

রাজনৈতিক ঘৃণার শিকার

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি বদল চেয়েছিল। সরকার বদলেছে, কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে ঘৃণার বীজ এখনো শিকড় ছাড়েনি। যে দেশে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একজন মৃত নারীর শরীরকে হুমকির লক্ষ্যবস্তু বানানো যায়, সে দেশ সত্যিকারের মুক্তির দিকে এগোচ্ছে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আওয়ামী লীগের নৈতিক দেউলিয়াত্ব

আওয়ামী লীগ কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, নৈতিকভাবেও পরাজিত হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ কর্তৃক নিরীহ মানুষ হত্যার প্রমাণ নথিভুক্ত হয়েছে। হাজারের বেশি মানুষকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর দলটির নেতৃত্ব ও সমর্থকদের কোনো অনুশোচনা নেই। নিজেদের কর্মপন্থা ফিরে দেখার চেষ্টা নেই। যুক্তরাজ্য সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দুর্নীতি উন্মোচিত হওয়ার পরও বিবেকে কোনো কম্পন নেই। এই মানসিকতার স্বাভাবিক পরিণতি মৃত্যু নিয়ে উল্লাস।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তুলনামূলক চিত্র

তুলনাটি আওয়ামী লীগের নৈতিক দেউলিয়াত্বকে স্পষ্ট করে। ১৩ মে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। রাষ্ট্র তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়ে এবং হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে সসম্মানে বিদায় জানায়। স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা সেই মুহূর্তে সহাবস্থানের নজির রেখেছিলেন।

একইভাবে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন। দুদকের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে ১০২ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন ও দুর্নীতির প্রমাণ থাকলেও তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্র হাজারো মানুষকে জানাজায় সমবেত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁর মরদেহকে অবমাননা করেননি।

এছাড়া নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে আজীবনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সশরীর তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে শেষশ্রদ্ধা জানান। জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শোকবার্তা আসে। কারণ, মৃত্যু এক শোকার্ত বাস্তবতা, যা মানুষকে শত্রু-মিত্র ভুলিয়ে দেয়।

কিন্তু আওয়ামী লীগের একটি অংশ এই মানবিক সত্যটুকু ভুলে গেছে। যারা একসময় দেশের উন্নয়নের ঝান্ডা উড়িয়েছে, সোনার বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছে, তাদের একাংশ আজ একজন তরুণীর মৃতদেহকে নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করছে।

নিরাপত্তা ও আইনের প্রশ্ন

বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ায় বাথ পার্টির সমর্থকদের নিগ্রহ, ইরাকে বাথ পার্টির সমর্থকদের সঙ্গে যা ঘটেছে, উগান্ডায় ইদি আমিনের পতনের পর তাঁর সমর্থকদের প্রতি আচরণের তুলনায় বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকেরা অনেক বেশি নিরাপদে আছেন এবং সেটিই কাম্য। কিন্তু এই নিরাপত্তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা ফ্রি পাস পেয়ে গেছেন বা মানুষ আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসন ভুলে গেছে।

নারী হিসেবে আক্রমণ

কারিনা কায়সারের মৃত্যুকে ঘিরে যা হচ্ছে, তার একটি বিশেষ মাত্রা আছে। তিনি নারী বলেই আক্রমণটি এই রূপ নিয়েছে। তিনি পুরুষ হলে হয়তো এই বীভৎসতা এতটা নিচে নামত না। কারিনা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন, তাই তাঁর প্রতি যা হচ্ছে তা আওয়ামী চেতনাধারী অনেকের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে না।

এই নীরবতাও একটি বার্তা দেয়। যাঁরা নিজেদের প্রগতিশীল মনে করেন, যাঁরা লিঙ্গসমতার কথা বলেন, তাঁদের একাংশ এই মুহূর্তে নিশ্চুপ। কারণ, কারিনার রাজনৈতিক পরিচয় তাঁদের কাছে অস্বস্তিকর। কিন্তু মানবিক মর্যাদা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। একজন মৃত মানুষের প্রতি এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হলে তাঁর রাজনীতির সমর্থক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব

রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে একটাই প্রশ্ন: কারিনা কায়সারের লাশ নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করা অ্যাকাউন্টগুলো কি চিহ্নিত করা হয়েছে? বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইন রয়েছে। কাউকে আত্মহত্যার প্ররোচনা, সাম্প্রদায়িক উসকানি, নাশকতার ডাক, বাল্যবিবাহের পক্ষে প্রচারণা বা মৃত মানুষকে যৌন হয়রানির হুমকি দিলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইনের আওতায় আনা। সাইবার স্পেস নিরাপদ রাখা পুলিশ ও রাষ্ট্রের কর্তব্য। কারিনা কায়সারকে নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু কুৎসিত হুমকি ও অশ্লীলতার প্রতিযোগিতা গ্রহণযোগ্য নয়।

উপসংহার

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি বদল চেয়েছিল। সরকার বদলেছে, কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে ঘৃণার বীজ এখনো শিকড় ছাড়েনি। যে দেশে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একজন মৃত নারীর শরীরকে হুমকির লক্ষ্যবস্তু বানানো যায়, সে দেশ সত্যিকারের মুক্তির দিকে এগোচ্ছে না। কারিনা কায়সার তাঁর সাহসী ভূমিকার জন্য যে সম্মানের ভাগীদার, আমরা তা দিতে পারিনি। বরং তাঁর মা-বাবার কাছে আমরা প্রমাণ করেছি যে আমরা কারিনা কায়সারের মতো যোদ্ধাদের যোগ্য নই।