এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নতুন করে চাপে পড়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তার, সেন্সরশিপ, অনলাইন নজরদারি, মামলা ও সহিংসতার কারণে সাংবাদিকরা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল সময়ে এশিয়ার বহু দেশে সংবাদমাধ্যমের ওপর নিপীড়ন বেড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক দেশ সংবিধান ও নীতিগতভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সাংবাদিকদের ওপর চাপ ও আত্মসেন্সরশিপ বেড়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও দুর্নীতিবিষয়ক সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতিতে কিছু উন্নতির আভাস মিললেও মিয়ানমার, পাকিস্তান, ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ফিলিপাইনকে এখনও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে দেখা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, সৌদি আরব ও সিরিয়াতেও সাংবাদিকদের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রয়েছে।
আফগানিস্তানে তালেবানের কড়াকড়ি
আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের নিয়ন্ত্রণে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হয়েছে। আফগানিস্তান জার্নালিস্ট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২০০-র বেশি হুমকি, গ্রেপ্তার ও সেন্সরশিপের ঘটনা ঘটেছে। মার্চে “রাহে-ফারদা” টিভি ও রেডিওর সম্প্রচার বন্ধ করে সম্পত্তি জব্দ করা হয়। একই সময়ে জীবন্ত প্রাণীর ছবি সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞার কারণে বহু টিভি চ্যানেল কার্যক্রম সীমিত করে। এপ্রিলেও কয়েকজন সাংবাদিককে আটক করা হয়। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, আফগান সাংবাদিকরা নিয়মিত ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাজ করছেন।
বাংলাদেশে পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত
বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিল সময়ে সাংবাদিক হত্যা বা বড় ধরনের হামলার ঘটনা না ঘটলেও আত্মসেন্সরশিপ ও সংবাদ ‘ব্ল্যাকআউট’-এর অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবাদপত্র মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে মুক্ত গণমাধ্যমের পক্ষে অবস্থানের কথা জানান। তথ্যমন্ত্রী জহিরুদ্দিন স্বপন সাংবাদিক সুরক্ষা আইন ও সাংবাদিক কল্যাণ বোর্ড গঠনের উদ্যোগের কথা বলেছেন। তবে ২৪ এপ্রিল শাহবাগে সংবাদ সংগ্রহের সময় কয়েকজন সাংবাদিক ছাত্রদল কর্মীদের হয়রানির শিকার হন। এছাড়া দুই সাংবাদিককে আটক ও দু’জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
চীন ও ভিয়েতনামে কঠোর দমননীতি
চীনে বর্তমানে ১৩৪ জনের বেশি সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মী কারাবন্দি রয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি। বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি, জিজ্ঞাসাবাদ ও চলাচলে বাধা বাড়ছে। রাজনৈতিক ও মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদন সেন্সরের আওতায় আনা হয়েছে। ভিয়েতনামেও স্বাধীন সাংবাদিকতা কার্যত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ। স্বাধীন সাংবাদিক Le Anh Hung-কে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার উদ্বেগ জানালেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
পাকিস্তান ও ভারতে চাপ অব্যাহত
পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাইবার আইন ও নিরাপত্তা বাহিনীর চাপের কারণে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ সংকুচিত হয়েছে। মার্চে নারী দিবসের মিছিল কাভার করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক আটক হন। এপ্রিল মাসে সিনিয়র সাংবাদিক ফখর-উর-রেহমানকে সামাজিক মাধ্যমে পোস্টের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ভারতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা বেড়েছে। মার্চ-এপ্রিলে অন্তত ১৯ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক সমাবেশ ও সহিংসতা কাভার করতে গিয়ে বহু সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন।
মিয়ানমারে স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রায় ভেঙে পড়েছে
মিয়ানমারে সামরিক জান্তার দমননীতির কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা কার্যত বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। এপ্রিল মাসে অন্তত তিনটি সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখনও বহু সাংবাদিক কারাবন্দি রয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে নজরদারি ও ভয়ভীতি
সৌদি আরবে সমালোচনামূলক মত প্রকাশকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাংবাদিক ও ব্লগারদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশটিতে অন্তত ২৩ সাংবাদিক কারাবন্দি রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে মিডিয়া ব্ল্যাকআউট, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা বেড়েছে। সিরিয়াতেও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও অপহরণের ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ফিলিপাইন ও কম্বোডিয়ায় প্রাণঘাতী ঝুঁকি
ফিলিপাইনে সাংবাদিক হত্যা, মামলা ও ‘রেড-ট্যাগিং’-এর ঘটনা বাড়ছে। মার্চে রেডিও সাংবাদিক Julito Diamante Calo গুলিতে নিহত হন। এপ্রিলেও এক কমিউনিটি সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কম্বোডিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ ও কনটেন্ট অপসারণের চাপ বেড়েছে। সীমান্ত ও দুর্নীতিবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সাংবাদিকরা বিশেষভাবে চাপে রয়েছেন।
উত্তর কোরিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতা নেই
উত্তর কোরিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম ছাড়া অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমের অনুমতি নেই। বিদেশি সংবাদ দেখা বা প্রচার করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশটি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে দমনমূলক সংবাদ পরিবেশের একটি।



