বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রধান উপদেষ্টা সেলসো আমোরিমের সঙ্গে ব্রাসিলিয়ার ঐতিহাসিক পালাসিও দো প্লানালতোতে এক বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী বৈঠকে মিলিত হন। শনিবার (১৫ মে) অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উভয়পক্ষ বাংলাদেশ-ব্রাজিল সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্ব, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং গ্লোবাল সাউথের সংহতির নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বৈঠকের সূচনা ও শুভেচ্ছা বিনিময়
বৈঠকের শুরুতেই উপদেষ্টা আমোরিম প্রেসিডেন্ট লুলার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি পৌঁছে দেন। তিনি বাংলাদেশকে গ্লোবাল সাউথের একটি উদীয়মান ও গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে অভিহিত করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রশংসা করেন।
৫৩ বছরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক
উভয় নেতা বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের দীর্ঘ ৫৩ বছরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। হুমায়ূন কবির বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ব্রাজিল ছিল দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্র, যারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বরং তা ধীরে ধীরে একটি বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিচ্ছে।
কৌশলগত ফোরাম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল উপদেষ্টা আমোরিমের ‘টেট-আ-টেট স্ট্র্যাটেজিক ফোরাম’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব। তিনি বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের উপদেষ্টা পর্যায়ে নিয়মিত একান্ত বৈঠকের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব দেন, যাতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ ও কৌশলগত সমন্বয় আরও গভীর হয়। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও নিয়মিত রাজনৈতিক বোঝাপড়া অত্যন্ত জরুরি।
উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এই প্রস্তাবকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানান এবং বলেন, এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আস্থা, কৌশলগত সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমন্বয় আরও সুদৃঢ় হবে।
জাতিসংঘের নির্বাচনে ব্রাজিলের সমর্থন
বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত ছিল যখন উপদেষ্টা আমোরিম প্রেসিডেন্ট লুলার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য ‘অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত বার্তা’ পৌঁছে দেন যে, এই বছরের ২ জুন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের নির্বাচনে ব্রাজিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করবে। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ সাইপ্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
উপদেষ্টা আমোরিম বলেন, বাংলাদেশের প্রতি ব্রাজিলের এই সমর্থন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গঠনমূলক ভূমিকা, অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিকতার প্রতি অঙ্গীকার এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতি আস্থার প্রতিফলন।
উপদেষ্টা কবির ব্রাজিলের এই সমর্থনের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্ব যখন যুদ্ধ, বৈষম্য, জলবায়ু সংকট ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার মতো জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন জাতিসংঘকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা
বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশ-ব্রাজিল বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন। তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন যে, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে তারা স্বীকার করেন যে, এই বিপুল সম্ভাবনার তুলনায় বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনও অপর্যাপ্ত।
উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের অর্থনীতি পরস্পরকে পরিপূরক করতে সক্ষম। বাংলাদেশ ব্রাজিল থেকে তুলা, সয়াবিন, চিনি, কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে, আর বাংলাদেশ ব্রাজিলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাটজাত পণ্য ও সিরামিক রফতানির সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়াতে পারে। তিনি সরাসরি শিপিং ব্যবস্থা, ব্যবসায়িক সংযোগ, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ভবিষ্যৎ চুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
উভয়পক্ষ চলতি বছরের ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনের পরপরই অনুষ্ঠিতব্য ফরেন অফিস কনসালটেশনস নিয়েও আলোচনা করেন। সেখানে কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চূড়ান্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
উপদেষ্টা আমোরিম বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতিবেশী পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জানতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। এর জবাবে উপদেষ্টা কবির বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে ‘সমতা, মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পৃক্ততার’ ভিত্তিতে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও যৌথ সমৃদ্ধিতে বিশ্বাস করে।
তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন, “বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী শাসনের মতো কখনোই নতজানু বা আত্মসমর্পণমূলক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করবে না। বাংলাদেশের কূটনীতি হবে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন, সক্রিয় এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শান্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সমন্বিত উন্নয়নের স্বার্থে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে বদ্ধপরিকর।
বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব
বৈঠকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও উদীয়মান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। উপদেষ্টা কবির বলেন, বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় অটল থাকবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও সংযোগ বৃদ্ধিতে চীনের সঙ্গে কৌশলগত অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে জ্বালানি, পারমাণবিক প্রযুক্তি ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপদেষ্টা আমোরিম এই বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রাজিল উভয়ই গ্লোবাল সাউথের প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বহুমেরুকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি বলেন, বহুপাক্ষিকতা কেবল শক্তির ভারসাম্যের ওপর নয়, বরং নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।
ব্রিকসের সদস্যপদ ও উন্নয়ন ব্যাংকের শাখা
বৈঠকে উপদেষ্টা কবির ব্রিকসের সদস্যপদ লাভে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিও উত্থাপন করেন এবং ব্রাজিলের সমর্থন কামনা করেন। এর জবাবে উপদেষ্টা আমোরিম অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বলেন যে, তিনি বিষয়টি প্রেসিডেন্ট লুলার সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবেন।
ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এসময় উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) সদস্য হলেও এখনও বাংলাদেশে ব্যাংকটির কোনও শাখা নেই। ফলে সীমিতসংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি ঢাকায় এনডিবির একটি শাখা স্থাপনের আহ্বান জানান, যা বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নকে আরও কার্যকর করবে।
প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সহযোগিতা
উপদেষ্টা আমোরিম বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল রূপান্তর, জনস্বাস্থ্য, শিল্প উদ্ভাবন ও প্রতিরক্ষা গবেষণায় সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
উপদেষ্টা কবির জানান, ইতোমধ্যে দুই দেশের মধ্যে ১০টি আইনগত দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং আরও ১৬টি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, কৃষি, শিক্ষা ও উদ্ভাবনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বহুপাক্ষিকতার ভবিষ্যৎ
বৈঠকের শেষাংশে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও বহুপাক্ষিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনা হয়। উপদেষ্টা আমোরিম জানতে চান, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ সন্তুষ্ট কিনা।
জবাবে উপদেষ্টা কবির বলেন, বিশ্ব এখন ‘আস্থা পুনর্গঠন, কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর এবং এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতিসংঘ’ চায়, যা সত্যিকার অর্থে সবার জন্য কাজ করবে। তিনি আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকতর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
উপদেষ্টা আমোরিম সম্মতি জানিয়ে বলেন, জাতিসংঘকে টিকে থাকতে হবে বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এবং বহুপাক্ষিকতাকে পুনর্গঠন করতে হবে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, সংলাপ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে।
সমাপ্তি
অত্যন্ত আন্তরিকতা, কৌশলগত বোঝাপড়া এবং নবায়িত আস্থার পরিবেশে বৈঠকটি শেষ হয়। কূটনৈতিক মহলে এই বৈঠককে ‘বাংলাদেশ–ব্রাজিল সম্পর্কের কৌশলগত পুনঃসূচনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, যা একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্লোবাল সাউথের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।



