যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় নিহত ১৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের এক যৌথ তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এখন পর্যন্ত এসব অভিযানে প্রায় ২০০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। খবর গার্ডিয়ানের।
তদন্তে কী উঠে এসেছে
'লাতিন আমেরিকান সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম' বা ক্লিপের নেতৃত্বে ২০ জন সাংবাদিক পাঁচ মাস ধরে তদন্ত চালিয়েছেন। তদন্তে দেখা গেছে, নিহতদের সবাই লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের অত্যন্ত দরিদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ। অনেকের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ১৯৪ জন নিহতের কারও পরিচয় হামলার আগে নিশ্চিত করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ পর্যন্ত মাত্র তিনজনের নাম প্রকাশ পেয়েছিল, যাদের পরিবার হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিল।
মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এসব হামলাকে 'নার্কো-টেররিস্টদের বিরুদ্ধে অভিযান' হিসেবে দাবি করে আসছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারে জড়িত ছিলেন। তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের মতে, নিহতদের অনেকেই চরম দারিদ্র্যের কারণে জীবিকার খোঁজে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত ছিলেন।
ক্লিপের পরিচালক মারিয়া তেরেসা রন্দেরোস বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে তারা মাদক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, কিন্তু বাস্তবে অত্যন্ত দরিদ্র পরিস্থিতিতে থাকা তরুণরা, যারা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য যেকোনো কাজ করতে বাধ্য, তারা এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, 'এখানে প্যাবলো এসকোবার বা 'এল চ্যাপো' গুজমানের মতো বড় মাদক সম্রাটদের ধরা হচ্ছে না।'
হামলার প্রভাব
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসব হামলা মাদক প্রবাহ কমাতে কার্যকর হয়নি, বরং স্থানীয়ভাবে দুর্বল ও ভাঙা সম্প্রদায়গুলোকে আরও বিপর্যস্ত করেছে। অনেক এলাকায় মানুষ আতঙ্কে সপ্তাহের পর সপ্তাহ মাছ ধরা বন্ধ রেখেছে, যার ফলে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
নিহতদের পরিচয়
এ পর্যন্ত শনাক্ত ১৬ জনের মধ্যে ৮ জন ভেনেজুয়েলার, ৩ জন কলম্বিয়ার, ২ জন ইকুয়েডরের, ২ জন ত্রিনিদাদের এবং ১ জন সেন্ট লুসিয়ার নাগরিক। ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা হলেন হুয়ান কার্লোস ফুয়েন্তেস (৪৩), লুইস রামন আমুন্দারাইন (৩৬), এদুয়ার্দ হিদালগো (৪৬), দুশাক মিলোভচিচ (২৪) এবং রবার্ট সানচেজ, জেসুস কারেনিও, এদুয়ার্দো জাইমে ও লুইস আলি মার্তিনেজ (এই চারজনের বয়স জানা যায়নি)। কলম্বিয়ার তিনজন নাগরিক আলেহান্দ্রো আন্দ্রেস কারানজা মেদিনা (৪২) এবং রোনাল্ড আররেগোসেস ও আদ্রিয়ান লুবো (এ দুজনের বয়স জানা যায়নি)। ইকুয়েডরের দুই নাগরিক পেদ্রো রামন হোলগুইন (৪০) ও কার্লোস ম্যানুয়েল রদ্রিগেজ সলোরজানো (৩৪)। ত্রিনিদাদের দুই নাগরিক চ্যাড জোসেফ (২৬) ও ঋষি সামারু (বয়স জানা যায়নি)। আরেকজন হলেন সেন্ট লুসিয়ার রিকি জোসেফ (বয়স জানা যায়নি)।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে নিহতরা মাছ ধরার কাজ করতেন, আবার কেউ কেউ দারিদ্র্যের কারণে ঝুঁকিপূর্ণভাবে মাদক পরিবহনে যুক্ত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে তাদের পরিবারগুলোর দাবি, অনেকেই নির্দোষ ছিলেন।
মার্কিন বক্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ কমান্ডের এক মুখপাত্র বলেন, সব হামলাই 'ইচ্ছাকৃত, বৈধ ও নির্ভুল' ছিল এবং তারা মাদক পাচারকারীদের লক্ষ্য করেই অভিযান চালিয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শামিল এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে।



