ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রানিনগর সীমান্ত এলাকায় প্রশাসনের নির্দেশে ১৯টি পরিবার তাদের বসতভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ৩৫ বছরের পুরনো বসতি একদিনে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকেই সরকারি নথিভুক্ত জমিতে বসবাস করছিলেন এবং চাষাবাদ করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন।
সীমান্ত নিরাপত্তার অজুহাতে উচ্ছেদ
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনার কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, তারা কোনো অপরাধ করেনি। রানিনগরের চর সরন্দাজপুরের পেঙ্গুপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও ভাঙা ঘরের বাঁশ পড়ে আছে, কোথাও উঠোন ফাঁকা। কয়েকদিন আগেও যেখানে শিশুদের কোলাহল ছিল, সেখানে এখন নীরবতা।
উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের বক্তব্য
উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দা আজবার আলি বলেন, “প্রায় ৩৫ বছর ধরে আমরা এখানে আছি। চাষাবাদ করেছি, সংসার চালিয়েছি। হঠাৎ করে উঠে যেতে হবে, কখনও ভাবিনি। এখন কোথায় যাব, কীভাবে জীবন চলবে, বুঝতে পারছি না।” স্থানীয়দের দাবি, ১৯টি পরিবারের মধ্যে অধিকাংশের অন্যত্র ছোটখাটো আশ্রয় থাকলেও মিলন শেখ ও রাইহান শেখের পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে। তাদের স্থায়ীভাবে থাকার মতো অন্য কোনো জায়গা নেই।
কৃষকদের দুর্ভোগ
আজবার আলি, তুফান শেখ, ইউনুস আলি ও মতি শেখসহ একাধিক কৃষক জানান, তাদের চাষের জমি এখনও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে। কিন্তু বসতবাড়ি সরে যাওয়ার পর প্রতিদিন সেখানে গিয়ে কাজ করা অনেক বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। সুজান শেখ জানান, “এতদিন বাড়ির পাশেই জমিতে কাজ করেছি। গরু-ছাগল পালন করেছি। এখন দূর থেকে সবকিছু দেখাশোনা করা খুব কঠিন হবে। সংসারের খরচ কীভাবে চলবে, সেই চিন্তাই এখন সবচেয়ে বড়।”
প্রশাসনের যুক্তি
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বসতিগুলো সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করছিল। নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে সেখানে নজরদারিতে সমস্যা হচ্ছিল। পাশাপাশি সীমান্ত অপরাধ ও চোরাচালানের ঝুঁকিও ছিল। এসব বিষয় বিবেচনা করেই পরিবারগুলোকে অন্যত্র সরে যেতে বলা হয়েছে। স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান মাফরোজা বিবি বলেন, “এলাকাটি সীমান্তের সংবেদনশীল অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। ভবিষ্যতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজও রয়েছে। মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বাসিন্দারা
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্তের জীবন এমনিতেই কঠিন। তার ওপর হঠাৎ করে বসতি ছেড়ে চলে যেতে হওয়ায় অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। প্রশাসনিক যুক্তির আড়ালে সীমান্তবাসীর কষ্টের ছবিটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। যেসব মানুষ বছরের পর বছর সীমান্ত পাহারা দেওয়া রাষ্ট্রের ছায়াতেই জীবন কাটিয়েছেন, তারাই আজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
কাঁটাতারের বেড়া হয়তো সীমান্তকে আরও সুরক্ষিত করবে। কিন্তু সেই বেড়ার ছায়ায় যে বহু মানুষের স্মৃতি, শেকড় আর জীবনসংগ্রামের গল্প চাপা পড়ে যাচ্ছে, রানিনগরের এই ১৯টি পরিবার তারই এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ।



