চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে মনজুর আলমের সম্ভাব্য প্রার্থীতার গুঞ্জন: এনসিপি নিয়ে আলোচনা
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে মনজুর আলমের প্রার্থীতার গুঞ্জন

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে মনজুর আলমের প্রার্থীতার গুঞ্জন: এনসিপি নিয়ে আলোচনা

আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) হয়ে মেয়র পদে প্রার্থী হতে পারেন, এমন গুঞ্জন ঘিরেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন মনজুর আলম, তবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কিংবা না নেওয়ার বিষয়ে কিছুই বলেননি তিনি।

হাসনাত আবদুল্লাহর সাক্ষাৎ ও রাজনৈতিক আলোচনা

গত ১৪ এপ্রিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে নগরের কাট্টলী এলাকায় মনজুর আলমের বাসভবনে সাক্ষাতের পর বিষয়টি আরও জোরালো হয়েছে। তিনি এনসিপির প্রার্থী হতে পারেন কিনা, এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে আলোচনা। যদিও দলটির নেতারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না, তবে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ইঙ্গিত মিলছে যে বিষয়টি দলীয় পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।

এনসিপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির নেতা আবুল বাকের মজুমদার তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, 'মনজুর আলম এনসিপি থেকে মেয়র নির্বাচন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সে বিষয়ে কথা বলার জন্যই হাসনাত আবদুল্লাহ মনজুর আলমের বাসায় গিয়েছেন।' তবে এনসিপির হয়ে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার তথ্যটি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সাবেক মেয়র মনজুর আলম।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মনজুর আলমের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অবস্থান

মনজুর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, 'সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি একান্তই ব্যক্তিগত এবং হাসনাতের আগ্রহেই হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে একটি পক্ষ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। হাসনাতের সঙ্গে এ নিয়ে কোনও কথা হয়নি। তার সঙ্গে সেটি ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি আরও বলেন, 'নববর্ষের দিন মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে হাসনাত আবদুল্লাহ আমাকে ফোন করে বলেন দুপুরে চট্টগ্রামে আসবেন। আমি তাকে আমার বাসায় লাঞ্চ করার জন্য বলি। যথারীতি ওই দিন আড়াইটার দিকে বাসায় আসেন। লাঞ্চ করেন। তবে রাজনৈতিক কোনও বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা হয়নি। একজন রাজনৈতিক নেতা বা এমপি যদি সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে চান, তাকে না করার সুযোগ কোথায়? কিন্তু তার আগমন ঘিরে আমার বাসার সামনে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে তা ঠিক হয়নি। নিশ্চই এর পেছনে কারও কোনও খারাপ উদ্দেশ্য আছে।'

আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মনজুর আলম বলেন, 'এখনও এ বিষয়ে আমি কোনও সিদ্ধান্ত নিইনি। যখন সিদ্ধান্ত নেবো তখন সবাই জানতে পারবে।'

রাজনৈতিক পটভূমি ও সাম্প্রতিক কার্যক্রম

মনজুর আলম বলেন, 'জীবনে আওয়ামী লীগের একটি সদস্য পদও ছিল না আমার। বরং বিএনপিতে সদস্য পদ নেওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া আমাকে তার উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন। বিএনপির হয়ে মেয়র নির্বাচন করে এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীকে হারিয়েছিলাম, তাও বিএনপির দুঃসময়ে। এসব কথা কেউ মনে রাখেনি।'

পেশায় ব্যবসায়ী মনজুর আলম শিল্পগোষ্ঠী মোস্তফা হাকিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে গত কয়েক দশক ধরে সম্পৃক্ত। তিনি স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় ১২০টি প্রতিষ্ঠান করেছেন। রাজনৈতিক পথচলাও দীর্ঘদিনের। তার বাবা আবদুল হাকিম কনট্রাকটর ছিলেন পাহাড়তলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। নিজেও আওয়ামী লীগের সমর্থনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

২০১০ সালে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করে তিনি প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। তবে ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পর রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দেন। ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। তবে ভোটের দিন নির্বাচন বর্জন করেন। এর আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ২০১৮ ও ২০২০ সালেও তিনি চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মনোনয়ন পাননি।

গত জানুয়ারির শেষ দিকে কাট্টলীর বাসার সামনে আয়োজিত এক সভায় তিনি বিএনপির পক্ষে ভোট চান। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন ওঠে, তিনি কি আবার বিএনপিতে সক্রিয় হচ্ছেন। এর আগে তার অর্থায়নে বেগম খালেদা জিয়া জামে মসজিদ নির্মাণ, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘিরে তাকে নিয়ে আলোচনায় শুরু হয়।

নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেনকে এগিয়ে রাখছেন দলের নেতাকর্মীরা। দল থেকে এখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র সম্ভাব্য প্রার্থী। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটির কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী না হলে জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপির প্রার্থীই হতে পারেন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। জাতীয় পর্যায়ে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে সমঝোতা থাকায় স্থানীয় নির্বাচনেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সেক্ষেত্রে এনসিপি শক্ত প্রার্থী দিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মনজুর আলম এনসিপির প্রার্থী হলে বিএনপির জন্য তা চ্যালেঞ্জ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দাতব্য ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় তার ব্যক্তিগত একটি ভোটব্যাংক রয়েছে।

বিএনপি ও এনসিপির প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'হাসনাত আবদুল্লাহরা সংসদে ফ্যাসিস্ট বা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লম্বা লম্বা কথা বললেও বাস্তবে নিজেদের স্বার্থে ফ্যাসিস্টদেরই পুনর্বাসন করছেন। ঢাকা থেকে উড়ে এসে মনজুর আলমের বাসভবনে হাসনাত আবদুল্লাহর দেখা করার বিষয়টি তারই প্রমাণ।'

এ ব্যাপারে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের সমন্বয়কারী ও মিডিয়া সেলের প্রধান রিদুয়ান হৃদয় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'সাবেক মেয়র মনজুর আলমের বাসায় হাসনাত আবদুল্লাহর যাওয়া শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ও সৌজন্যমূলক। এখনও চসিক নির্বাচনের দেরি আছে। মনজুর আলম এনসিপির হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন এ ধরনের দলীয় কোনও সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। লোকমুখে যেটা রটেছে, তার বাস্তব কোনও ভিত্তি নেই।'