ফরিদপুরে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন সভা: গোপালগঞ্জের বরাদ্দ নিয়ে তীব্র বিতর্ক
ফরিদপুরে আঞ্চলিক উন্নয়ন সভা: গোপালগঞ্জ বিতর্ক

ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচ জেলার সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও জেলা পরিষদ প্রশাসকদের নিয়ে ‘ফরিদপুরে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার বিকালে আয়োজিত এই সভায় বিগত ১৭ বছরে গোপালগঞ্জের জন্য সরকারি নানা বরাদ্দ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে, যা আঞ্চলিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো উন্মোচন করেছে।

গোপালগঞ্জের বরাদ্দ নিয়ে তীব্র বিতর্ক

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বক্তব্য দেন। তিনি গত ১৭ বছরে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন খাতে বেশি বরাদ্দ দেওয়া এবং ওই বরাদ্দের বিপরীতে কী কাজ হয়েছে, তা খতিয়ে দেখে একটি নিরপেক্ষ প্রতিবেদন প্রস্তুত করার জন্য গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। প্রধান অতিথি বলেন, ‘বিগত ১৭ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বিভাগ হিসেবে ঢাকাকে এবং জেলা হিসেবে গোপালগঞ্জকে। বর্তমান সরকার প্রতিহিংসার রাজনীতি করে না। এক গোপালগঞ্জ সারা বাংলাদেশের জন্য কী পরিমাণ ঋণ সৃষ্টি করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

স্থানীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক আরিফুজ্জামান স্বীকার করেন যে, গোপালগঞ্জে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, তবে রক্ষণাবেক্ষণ সেভাবে করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘কিছু লোকের উন্নয়ন হয়েছে, তবে বেশির ভাগই অবহেলিত অবস্থায় আছে।’ গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক শরিফ রাফিকুজ্জামান আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে গোপালগঞ্জে উন্নয়নের কথা শোনা গেছে। কিন্তু ইট খাড়া করা ছাড়া সফটওয়্যারের উন্নয়ন হয়নি। গোপালগঞ্জের জন্য কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং কত টাকার কাজ হয়েছে, এর ওপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হলে এই ফ্যারাকটা ভালোভাবে বোঝা যেত।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক মাত্রা

গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান গোপালগঞ্জ সংক্রান্ত আলোচনার সমাপ্তি টেনে বলেন, গোপালগঞ্জের তিনটি আসনের সব কটিতে বিএনপি জয়লাভ করেছে। তিনি দাবি করেন, ‘এই এলাকার মানুষ বিএনপির প্রতি যে অনুরাগ দেখিয়েছেন, তার প্রতিদান প্রধানমন্ত্রীকে দিতে হবে।’ অন্যদিকে, গোপালগঞ্জের সংসদ সদস্য কে এম বাবর অভিযোগ করেন, ‘গোপালগঞ্জে অতীতে যেসব প্রকল্প করা হয়েছে, তা আয়ের উৎস না হয়ে ভর্তুকিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। গোপালগঞ্জবাসী বর্তমান সরকারের প্রথম বৈষম্যের শিকার হয়েছে।’

আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রস্তাবনা

বিশেষ অতিথি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ তার বক্তব্যে এই পাঁচ জেলার সম্পদের সুষম বণ্টনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘এই পাঁচ জেলার প্রতিটিতে কিছু না কিছু সম্পদ আছে। কারও ম্যানপাওয়ার আছে, কারও পাট আছে, কারও পেঁয়াজ আছে। স্টাডি করে কোন জেলায় কী ঘাটতি রয়েছে, তা বের করে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা, ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর, পাটশিল্পকে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা, নারী উদোক্তাদের প্রণোদনা দিয়ে অঞ্চলভিত্তিক কুটিরশিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থান

শামা ওবায়েদ আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়াতে ভোকেশনাল শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রচলিত শিক্ষার ধ্যানধারণা থেকে বের হয়ে এসে কারিগরি শিক্ষার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।’ এই মন্তব্য আঞ্চলিক উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে।

অন্যান্য বক্তাদের মতামত

ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বিগত সরকারের সময়ে অন্যায়ভাবে সরকারি বেশ কিছু আঞ্চলিক কার্যালয় গোপালগঞ্জে স্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এবং এসব প্রতিষ্ঠান অন্য জেলায় সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। তবে প্রধান অতিথি এই প্রস্তাব নাকচ করে বলেন, ‘একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন জেলার সদরে স্থাপন করা হলে তা জনকল্যাণে ভূমিকা রাখতে সহজ হয়।’

ফরিদপুর-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা দেশের সংকটের জন্য রাজনীতিবিদদের দায়ী করে বলেন, ‘সরকারপ্রধান সব সময় দেশের সঠিক চিত্র পান না কিংবা তাকে তা দেওয়া হয় না। এ ব্যাপারে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা ভূমিকা রাখতে পারেন।’ শরীয়তপুরের এমপি সাঈদ আহমেদ সংসদ সদস্যদের জন্য নিজ এলাকায় কার্যালয় থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, ‘এতে কাজের গতি ত্বরান্বিত হবে। কাজের পরিবেশ সৃষ্টি হবে।’

অনুষ্ঠানের বিস্তারিত

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম, জেলা পরিষদের প্রশাসক সরদার এ কে এম নাসির উদ্দিন, পুলিশ সুপার রওনক জাহান, ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্লা, জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন, পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম, মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার, জেলা পরিষদের প্রশাসক খন্দকার মাশুকুর রহমান, পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান, গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুল্লাহ, রাজবাড়ি জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম মিয়া, পুলিশ সুপার মঞ্জুর মোর্শেদ প্রমুখ। এই সভা বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।