১৩৩ অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ: ১৬টি বিল আনা হয়নি, ৭টি বাতিল, ১১০টি অনুমোদন
১৩৩ অধ্যাদেশের ভাগ্য: ১৬টি বিল আনা হয়নি, ৭টি বাতিল

১৩৩ অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ: সংসদে অনুমোদন, বাতিল ও কার্যকারিতা হারানো

জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য চূড়ান্ত হয়েছে। রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় ১১০টি অধ্যাদেশ অনুমোদন পেয়েছে, ৭টি রহিত করা হয়েছে এবং ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা না হওয়ায় কার্যকারিতা হারিয়েছে।

অধ্যাদেশগুলোর শ্রেণিবিভাগ ও সরকারের পরিকল্পনা

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপন করা হয়। নির্ধারিত সময়সীমা ১০ এপ্রিলের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা না হওয়ায় সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এগুলোর মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধনী অধ্যাদেশ উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ৭টি রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে।

সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করলেও সব সুপারিশ হুবহু অনুসরণ করা হয়নি। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, ১৬টি অধ্যাদেশ অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন বলে সেগুলো এখনো উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি বিভ্রান্তি ছড়ানো বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আইনগুলোর প্রস্তাবনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয় স্পষ্ট থাকলেও অনেকে তা উপেক্ষা করছেন।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া ও সরকারের জবাব

গুম অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ বিল আকারে না আনার প্রতিবাদে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। তারা সরকারের বিরুদ্ধে “রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিশ্বাসভঙ্গের” অভিযোগ তোলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে বলেন, “সংসদীয় রীতি অনুসারে বিরোধী দল ওয়াকআউট করতে পারে, কিন্তু তাদের ইস্যুতে কিছু তথ্য সঠিক ছিল না। তারা বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের ওপর দোষ চাপিয়েছে।”

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষ কমিটির হুবহু অনুমোদনের সুপারিশ ছিল, কিন্তু বিলে সংশোধনী আনা হলে সংসদে দীর্ঘ বিতর্ক হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, “কোনো বেসরকারি সদস্য যদি বিলে সংশোধনী আনেন এবং সেটি যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, তবে ভোটাভুটির মাধ্যমে তা গৃহীত হয়।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পরে সংশোধিত আকারে বিল আনার সম্ভাবনা রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ

সরকার গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশগুলো নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন বিল আনার পরিকল্পনা করেছে। আইনমন্ত্রী বলেন, “এগুলো নিয়ে অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। আমরা বিল আকারে এনে এই কমিটমেন্ট দিয়েছি যে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আবার আনব।” আগের সংসদগুলোর মতো না করে বর্তমান সরকার আলোচনার মাধ্যমে আইন সমৃদ্ধ করতে চায় বলে তিনি দাবি করেন।

গুম অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, যিনি নিজেও গুমের শিকার, বলেন, “অধ্যাদেশটি সেভাবে পাস হলে গুমের শিকার ব্যক্তিরা অবিচারের শিকার হবেন। আমরা চাই গুম কমিশন এমনভাবে হোক, যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।” তিনি আরও যোগ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের তড়িঘড়ি করা আইনে ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে, কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময় আছে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণভোট অধ্যাদেশ

বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো রহিত করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাই, কিন্তু সুপার স্বাধীন হলে রাষ্ট্রের কল্যাণ নাও হতে পারে। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর মধ্যে সুষম সহযোগিতা থাকা দরকার।” তিনি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ নিয়ে “ভেরি ব্যালান্সড” আইন আনার কথা বলেন।

গণভোট অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারালেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটিকে “ফ্যাক্টাম ভ্যালেট” বা ঘটনাক্রমে সিদ্ধ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “এই আইনে আগামীতে আর গণভোট হবে না। ভবিষ্যতে করতে হলে সংবিধান অনুসারে বা আলাদা আইনে করতে হবে।” ইতিমধ্যে গণভোটের বৈধতা নিয়ে আদালতে রিট হয়েছে বলে তিনি জানান।

১৬টি কার্যকারিতা হারানো অধ্যাদেশের তালিকা

আইন মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে আনা না হওয়ায় সেগুলো কার্যকারিতা হারিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • গণভোট অধ্যাদেশ
  • গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ
  • দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধনী অধ্যাদেশ
  • পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ
  • বেসামরিক বিমান চলাচল সংশোধনী অধ্যাদেশ
  • বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ সংশোধনী অধ্যাদেশ
  • মাইক্রো ফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ
  • বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা সংশোধনী অধ্যাদেশ
  • রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ
  • মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক দ্বিতীয় সংশোধনী অধ্যাদেশ
  • কাস্টমস সংশোধনী অধ্যাদেশ
  • আয়কর সংশোধনী অধ্যাদেশ
  • বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট সংশোধনী অধ্যাদেশ
  • তথ্য অধিকার সংশোধনী অধ্যাদেশ

সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার অভাবে এই অধ্যাদেশগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ায় উঠতে পারেনি। তবে সরকার ভবিষ্যতে সংশোধিত আকারে কিছু বিল আনার আশ্বাস দিয়েছে, যদিও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।