গ্রেফতারের আগে দেড় বছর: শিরীন শারমিন চৌধুরী কোথায় ছিলেন?
গ্রেফতারের আগে দেড় বছর শিরীন শারমিন কোথায়?

গ্রেফতারের আগে দেড় বছর: শিরীন শারমিন চৌধুরী কোথায় ছিলেন?

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে তাকে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করে পুলিশ। সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে দুই দিনের রিমান্ড আবেদন জানানো হলে সেটি নামঞ্জুর করে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত।

দেড় বছর পর গ্রেফতার

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটার দেড় বছরেরও বেশি সময় পর গ্রেফতার হলেন টানা তিনবারের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে মিন্টো রোডের কার্যালয়ে নিয়ে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ঢাকা ও রংপুরে জুলাইয়ের একাধিক হত্যা মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম রয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, "এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকার লালবাগ থানায় হওয়া একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে কোর্টে চালান করা হয়।" পাঁচই আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ২৭ দিনের মাথায় স্পিকার পদ থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরী সরে দাঁড়ান বলে জানিয়েছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তারা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আত্মগোপনের রহস্য

এরপর গত দেড় বছরে তাকে আর প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি। এই সময়ের মধ্যে তার অবস্থান নিয়ে নানান গুঞ্জন শোনা গেছে। গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের মুখে ২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকে গ্রেফতার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জনরোষে প্রাণহানির আশঙ্কায় সেসময় অনেকে বিভিন্ন সেনানিবাসেও আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, বিচারক, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরা ছিলেন বলে ২০২৪ সালের ১৮ই আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।

সেনানিবাসে আশ্রয়

প্রাথমিকভাবে সবার নাম পরিচয় প্রকাশ করা না হলেও বছরখানেকের মাথায় গত বছরের ২২শে মে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় আওয়ামী লীগের অন্য অনেক নেতাদের সঙ্গে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নামও ছিল। সেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সপরিবারে ঢাকা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

সেখানে থাকা অবস্থাতেই ২০২৪ সালের দোসরা সেপ্টেম্বর শিরীন শারমিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান বলে ধারণা করা হয়। কীভাবে তিনি সেনানিবাসে গিয়েছিলেন, সেটির একটি বর্ণনা পাওয়া যায় সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি জবানবন্দিতে।

লুকিয়ে থাকার বিবরণ

গত বছরের এপ্রিলে জুনাইদ আহমেদ পলক আদালতকে জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের দিন সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুসহ তারা প্রায় ১২ জন জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের একটি কক্ষে "লুকিয়ে ছিলেন"। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনী সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যান বলে জানান পলক।

কিছুদিন পর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিকালে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হন। কিন্তু শিরীন শারমিন চৌধুরীর কোনো খোঁজ তখন পাওয়া যায়নি। তিনি কতদিন সেনানিবাসে ছিলেন এবং কবে বের হন, সে বিষয়েও আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

গ্রেফতারের ঘটনা

প্রায় দেড় বছর পর "গোপন তথ্যের ভিত্তিতে" মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার নিজ বাসা থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেফতার হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জানতে পেরেছেন যে, সেনানিবাস থেকে বের হওয়ার পর দেশের ভেতরেই বিভিন্ন জায়গায় "আত্মগোপনে ছিলেন" শিরীন শারমিন চৌধুরী।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, "উনি বলছেন যে, এতদিন দেশেই ছিলেন। যে বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটা তার স্বামীর নামে বলে জানতে পেরেছি। ধরা পড়ার আগে তিনি কোথায় কোথায় ছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।"

মামলার তালিকা

গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ অন্তত অর্ধ ডজন মামলায় আসামি হিসেবে নাম রয়েছে শিরীন শারমিন চৌধুরীর। এর মধ্যে একটি রংপুরের শ্রমিক মুসলিম উদ্দিন হত্যা মামলা। এজাহারের তথ্য থেকে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তিনি নিহত হন।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৭শে আগস্ট নিহতের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বাদী হয়ে আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। সেখানে শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়। টিপু মুনশিকে আগেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

ঢাকার লালবাগ থানাতেও জুলাইয়ের একটি হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে মামলাটিতেই গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হচ্ছে তাকে। তবে অন্য মামলাগুলোতেও পর্যায়ক্রমে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেফতার দেখানো হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।

রাজনৈতিক পটভূমি

উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে যান শিরীন শারমিন চৌধুরী। এরপর মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। নবম সংসদের শেষ দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর সেসময়ের স্পিকার আবদুল হামিদকে রাষ্ট্রপতি বানায় আওয়ামী লীগ সরকার।

এরপর ২০১৩ সালে ৩০শে এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত শিরীন শারমিন চৌধুরী টানা তিন মেয়াদে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন।