জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিদ্যুৎ খাতের সংকট ও দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনাকালে আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলে বিদ্যুৎ খাতে কোনও ‘অব্যস্থাপনা’ হয়নি, হয়েছে লাগামহীন দুর্নীতি ও পরিকল্পিত চুরি।”
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৩তম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া এক বক্তব্যের সূত্র ধরে পার্থ বলেন, “ফ্যাসিস্ট আমলের ‘অব্যবস্থাপনা’ শব্দটি এই ভয়াবহ লুণ্ঠনের তুলনায় অত্যন্ত নরম ও মৃদু একটি শব্দ। মূলত বাপেক্সকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর প্রত্যক্ষ মদদে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছিল। এরপর কুইক রেন্টালের নামে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, যার বোঝা এই জাতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে।”
তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে পার্থ বলেন, “বর্তমানে কেন তরুণ সমাজ বারবার কেবল জুলাইয়ের ৩৬ দিনের গণঅভ্যুত্থানের কথাই বলে, তার কারণ আমাদের অনুধাবন করতে হবে। ২০০৮ থেকে গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ যে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছে, তা আমরা তরুণদের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারিনি।”
পার্থ বলেন, “বর্তমান অনেক সংসদ সদস্যের বয়স যখন মাত্র ১০ বছর ছিল, তখন শেয়ারবাজারের ‘দরবেশের’ কবলে পড়ে ৩০ লাখ মানুষ ফকির হয়েছে। বিডিআর পিলখানা হত্যাকাণ্ড কিংবা শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামাদের যেভাবে অপমান করা হয়েছে, সেই ক্ষতগুলো আজকের প্রজন্ম হয়তো সেভাবে ফিল করে না। ইয়াবা সম্রাট বদি কিংবা মমতাজের মতো ব্যক্তিদের এই পবিত্র সংসদে বসিয়ে সংসদকে কলঙ্কিত করা হয়েছিল, যা তরুণদের জানানো অত্যন্ত জরুরি।”
বিচার বিভাগ ও প্রশাসন প্রসঙ্গে পার্থ বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলে বিচার বিভাগকে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে যে, খোদ একজন প্রধান বিচারপতিকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার রায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম গণভবনের বারান্দায় বসে লেখা হতো।”
শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “শিক্ষাকে এমন তলানিতে নেওয়া হয়েছে যে, জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী আজ ইংরেজি বলা তো দূরে থাক, ঠিকমতো পাসপোর্ট চিনতেও ভুল করবে। এই পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞ থেকে দেশকে উদ্ধারের ঐতিহাসিক দায়িত্ব এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর পড়েছে।”
বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও তার জোটের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করেন পার্থ। তিনি একে ‘দ্বিমুখী আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “জিয়া পরিবারকে নিয়ে কটূক্তি করা কিংবা রাজপথে আন্দোলনের ডাক দিয়ে আবার সংসদে ভিন্ন সুরে কথা বলা রাজনৈতিক ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। আওয়ামী লীগ সরাতে ১৭ বছর লাগলেও বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে ১৬ দিনও সময় লাগবে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রবাসীদের ও গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য সংসদের উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাব দেন।” একই সঙ্গে ব্যাংক লুট ও অর্থনৈতিক অপরাধের লাগাম টানতে ‘ইকোনমিক ট্রিজন’ বা অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা আইন পাসের জোর দাবি জানান তিনি।
ব্যারিস্টার পার্থের এমন তীব্র আক্রমণের মুখে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান দ্রুত প্রতিবাদ জানান। তিনি পার্থের বক্তব্যের তথ্যের উৎস এবং রেফারেন্স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শফিকুর রহমান স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “এই ফ্লোরে দাঁড়িয়ে যখন কোনও ডকুমেন্ট হাতে নিয়ে আমরা কোনও রেফারেন্স দেবো, তা শুড বি ক্লিয়ার অ্যান্ড এপ্রোপ্রিয়েট। কনফিউজিং ওয়েতে রেফারেন্স প্রেজেন্ট করলে প্রবলেম ক্রিয়েট হয়।”
শফিকুর রহমান বলেন, “আমি এই ধরনের রেকলেস কথা কারও নামেই বলি না। এমনকি শেখ হাসিনার পরিবারের নামেও বলি না। যে দোষ করবে তার শাস্তি হবে, অন্য কেউ বললে সেটা আমার নামে চালালে হবে না।” ব্যারিস্টার পার্থ সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য এবং সংসদকে উত্তপ্ত করার উদ্দেশ্যেই তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনছেন বলে দাবি জানান তিনি।
সংসদ অধিবেশনের এই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের সময় স্পিকার উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান। স্পিকার বলেন, “মহান জাতীয় সংসদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা সকল সদস্যের দায়িত্ব।”
পার্থ বলেন, “আমি ডকুমেন্ট নিয়েই কথা বলছি। আজকের ডিজিটালাইজেশনের যুগে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পার পাওয়া সম্ভব না। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে যারা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।” একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ড ও জিয়া পরিবার নিয়ে তাদের নেতিবাচক প্রচারণার বিষয়ে তার কাছে আরও অনেক দালিলিক প্রমাণ রয়েছে, যা তিনি পর্যায়ক্রমে সংসদের সামনে উপস্থাপন করবেন এবং সারাদিন বলতে পারবেন বলে জানান।



