রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের চার মাস পেরিয়ে গেলেও ঘটনার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী বা সমন্বয়কারীদের এখনো শনাক্ত করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া ও অনলাইনে উসকানি দেওয়া অনেককে শনাক্ত করার কথা বলছে পুলিশ। তবে হামলার ছক কারা কষেছিল, কত দিন ধরে প্রস্তুতি চলছিল, এতে অর্থ বা রাজনৈতিক সহায়তা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
তদন্তে ধীরগতি
মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলছে, তারা সরাসরি হামলাকারীদের পাশাপাশি উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছে। এ কারণে তদন্ত শেষ করতে আরও সময় লাগছে। ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ঘোষিত দুই মাসের সময়সীমার মধ্যে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী। একই রাতে ফার্মগেটের কাছে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ও ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা
ওই হামলার দুই মাস পর ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো ভবনে ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শনে আসেন নবগঠিত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সেদিন তিনি বলেছিলেন, দুই মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। ঘোষিত সেই সময়সীমা আজ ২৮ এপ্রিল শেষ হচ্ছে।
তবে তদন্তকারী সংস্থা এখনো অভিযোগপত্র দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। সরাসরি হামলাকারী ও অনলাইনে উসকানিদাতাদের বিষয়ে কিছু অগ্রগতি থাকলেও তদন্ত এখনো নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা বা সমন্বয়কারীদের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
গ্রেপ্তার ও জামিন
ঘটনার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুলিশ ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ৩ এপ্রিল এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় আতাউর রহমান বিক্রমপুরীকে। তাঁকে এর আগে গত বছর ২৩ ডিসেম্বর আটক করে জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনায় ডিটেনশন দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছিল সরকার।
এরপর ৯ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে আরও ১১ জনকে প্রথম আলোর মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। তাঁরা এর আগে ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে হামলার মামলায় গ্রেপ্তার ছিলেন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রথম আলো ভবনে হামলা মামলায় গ্রেপ্তার আসামির সংখ্যা ৩৮। তাঁদের ১০ জন ইতিমধ্যে জামিনে মুক্ত হয়েছেন, যাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
তদন্তের চ্যালেঞ্জ
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার আসামিদের বাইরে আরও কিছু হামলাকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে রাখায় তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কয়েকজনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে পরিচয় জানতে মেটা কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেছে তদন্তকারী সংস্থা।
তদন্তের বিষয়ে যতটা খবর পাওয়া যাচ্ছে, হামলার দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা লাইভ, আপলোড করা ভিডিও ও ছবিকেন্দ্রিক অনুসন্ধানে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কারা পরিকল্পনা করেছে, কত দিন ধরে প্রস্তুতি চলছিল, কারা এতে সহায়তা ও সমন্বয় করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
উসকানি ও অপপ্রচার
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথম আলোর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে উসকানি ও গুজব ছড়িয়ে হামলার জন্য আহ্বান জানায় স্বার্থান্বেষী একটি গোষ্ঠী। তাদের একটি দল শাহবাগে সংগঠিত হয়ে প্রথমে রাত ১১টার দিকে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ের সামনে এসে নানা স্লোগান দিতে থাকে।
এরপর রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে শাহবাগ থেকে সংঘবদ্ধ আরেকটি দল প্রথম আলো ভবনের সামনে আসে। এসেই তারা ভবনের ফটকের শাটার ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলাকারীদের একটি অংশ আগুন নেভাতে আসা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি মূল সড়কে আটকে দেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা
ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তাঁরা নিষ্ক্রিয় ছিলেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। ততক্ষণে পুরো ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পুড়ে ছাই হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, আসবাব, কম্পিউটার, টেলিভিশনসহ নানা সরঞ্জাম।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একাধিক বাহিনী ও সংস্থা-সংশ্লিষ্ট সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, উগ্রপন্থী একটি গোষ্ঠী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির মৃত্যুকে 'উপলক্ষ' হিসেবে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আক্রমণ করিয়েছে। একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওই রাতে ছায়ানটে এবং পরদিন উদীচী কার্যালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।
ইউটিউবারদের ভূমিকা
অনেক দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রথম আলোর বিরুদ্ধে অনলাইনে প্রচারণা ও উসকানি দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অগ্রভাগে ছিলেন বিদেশে অবস্থানরত ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসেন। তাঁরা অনেক দিন ধরে হামলার উসকানি দিয়ে আসছিলেন। তাঁদের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পর্যালোচনা করছেন। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, এ ধরনের প্রচারণা দেশের ভেতরে থাকা একটি উগ্র গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করেছে।
এঁদের প্ররোচনায় এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর প্রথম আলোর কার্যালয়ের সামনে গরু জবাই এবং কয়েক দিন ধরে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে উগ্র একটি গোষ্ঠী।
পরিকল্পিত হামলা
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ওই সময় থেকে প্রথম আলোকে লক্ষ্যবস্তু করে একটি গোষ্ঠী প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে তারা প্রথম আলোতে চূড়ান্ত হামলার মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেয়। এ ক্ষেত্রে উগ্রপন্থী একটি গোষ্ঠীর পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কিছু সাবেক ও বর্তমান নেতা-কর্মীর অনলাইন তৎপরতাও পর্যালোচনায় আছে। তাঁদের অপপ্রচারের মূল লক্ষ্য ছিল প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর ওপর হামলার ন্যায্যতা সৃষ্টি করা।
প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলার আগে শিবির-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা-কর্মী ফেসবুক পোস্ট ও লাইভে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। তাঁদের কেউ কেউ অপপ্রচারের পাশাপাশি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার বন্ধ করার আহ্বান জানান।
সমন্বিত তদন্তের প্রয়োজনীয়তা
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলার ঘটনাগুলো যেহেতু একই রাতে পরপর ঘটেছে, তাতে বোঝা যায় এর পেছনে সমন্বয় ছিল। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সঠিক তদন্ত না হওয়ার পেছনে কিছু রাজনৈতিক কারণ নিঃসন্দেহে ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলার ঘটনাগুলো যেহেতু একই রাতে পরপর ঘটেছে, তাতে বোঝা যায় এর পেছনে সমন্বয় ছিল। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সঠিক তদন্ত না হওয়ার পেছনে কিছু রাজনৈতিক কারণ নিঃসন্দেহে ছিল।
জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী মনে করেন, বর্তমান সরকার এ ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তারা ভবিষ্যতে এই সরকারের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে। ফলে এই ঘটনায় দায়ী ব্যক্তি, যারা ঘটনা ঘটিয়েছে ও সমন্বয় করেছে, বর্তমান সরকারের নিজের স্বার্থেই সঠিকভাবে তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।



