জাতীয় সংসদের দিনের কার্যসূচিতে ছন্দপতন ঘটেছে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকাল ৩টায় অধিবেশন শুরুর কথা থাকলেও তা শুরু হয় ছয় মিনিট দেরিতে। পরে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিস নিষ্পত্তির সময় সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রী ও নোটিশদাতা সংসদ সদস্যকে সংসদ কক্ষে পাওয়া যায়নি।
বিধি ৭১ এর নোটিস স্থগিত
এ অবস্থায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিধি ৭১ এর নোটিসগুলোর নিষ্পত্তি স্থগিত রেখে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা শুরু করেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত হলে ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা স্থগিত রেখে আবার আগের কার্যসূচিতে ফেরেন স্পিকার।
জামায়াত সদস্যের পয়েন্ট অব অর্ডার
এ নিয়ে সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল। তিনি অধিবেশন দেরিতে শুরু হওয়া এবং উপস্থিতির বিষয়ে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সংসদে আমরা সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি আছি। আমাদের কাছে জাতি সর্বাধিক পরিমাণ সহানুভূতি আশা করে। তিনি রোববার ও সোমবার দেরিতে শুরু হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
চিফ হুইপের ব্যাখ্যা
সংসদের বৈঠক দেরিতে শুরুর কারণ ব্যাখ্যা করে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেন, সংসদ এ পর্যন্ত সময়মতো বসেছে। শুধু রোববার সংসদীয় দলের বৈঠক ছিল। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম থাকার কারণে আমাদের ১০ মিনিট দেরি হয়েছে। আমরা হিসাব করেছি। ১০ মিনিট পরেই আমরা সংসদে এসেছি। এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কিন্তু কথাটা হলো, ১০ মিনিটের জায়গায় যদি আধা ঘণ্টা বলেন, সেটা একটু অসুবিধা।
সোমবারের অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী যশোর গিয়েছেন। সঙ্গত কারণে অনেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীও সেখানে গেছেন। কাজেই সে কারণেও আজকে একটু দেরি হতে পারে। তবে আমরা চেষ্টা করব সবাই মিলে, ভবিষ্যতে যেন সবাই টাইম নিয়ে আসি।
স্পিকারের বক্তব্য
পরে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, সংসদের কার্যক্রম যে কোনো সরকারি কার্যক্রমের চেয়ে অগ্রাধিকার পায়। তিনি বলেন, একটি বিষয় আমি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, সংসদের কার্যক্রম যে কোনো সরকারি কার্যক্রমের চেয়ে অগ্রাধিকার লাভ করে।
স্পিকার আরও বলেন, রোববার তিনি ছিলেন না, ডেপুটি স্পিকার ছিলেন। ডেপুটি স্পিকার সোমবার বিকাল ৩টায় অধিবেশন বসার সময় ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সদস্যরা দেরিতে আসার কারণেই বিলম্ব হয়েছে। সুতরাং আমি শুধু অনুরোধ জানাতে পারি যে স্পিকারের চেয়ার থেকে যে, সময় ঘোষণা করা হবে পরবর্তী অধিবেশনের জন্য, মাননীয় সদস্যরা সেই সময়মতো সংসদে উপস্থিত থাকলে আর কোনো সমস্যা হবে না।
নোটিস নিষ্পত্তির ঘটনা
দিনের কার্যসূচির শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপন করেন স্পিকার। এরপর বিধি ৭১ এর নোটিস নিষ্পত্তির কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথম নোটিসটি ছিল নোয়াখালীর বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের। রাজধানীর অভিজাত এলাকার আবাসিক ভবন, রেস্তোরাঁ ও ক্যাফের আড়ালে গড়ে ওঠা অবৈধ শিষা লাউঞ্জ বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নোটিসটি আনা হয়।
স্পিকার তাকে নোটিস পড়ার আহ্বান জানান। তখন তিনি বলেন, কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় কী আছেন? পরে জয়নুল আবদিন ফারুককে অপেক্ষা করতে বলেন স্পিকার। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর আসতে একটু দেরি হচ্ছে।
দ্বিতীয় নোটিসটি ছিল কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের। দাউদকান্দির গৌরীপুর বাজারে যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নোটিসটি আনা হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম তখন উপস্থিত না থাকায় সেটিও অপেক্ষায় রাখা হয়।
তৃতীয় নোটিসটি ছিল সুনামগঞ্জ ১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের। হাওর এলাকায় বজ্রপাতজনিত ক্ষতি মোকাবেলায় গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নোটিসটি আনা হয়। তখন নোটিসদাতা সংসদ সদস্যই সংসদ কক্ষে উপস্থিত ছিলেন না।
এ অবস্থায় স্পিকার বলেন, বিধি ৭১ অনুসারে গৃহীত নোটিসগুলোর নিষ্পত্তি স্থগিত রাখা হলো। এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা শুরু হয়। তবে এ আলোচনাতেও একাধিক সংসদ সদস্যের নাম ডাকা হলেও তারা উপস্থিত ছিলেন না। একজন সংসদ সদস্য উপস্থিত থাকলেও প্রস্তুত নন জানিয়ে পরে বক্তব্য দেবেন বলেন।
মন্ত্রীদের ফেরা
প্রায় এক ঘণ্টা পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ও সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল সংসদ কক্ষে ফেরেন। তারা ফেরার পর ফের বিধি ৭১ এর নোটিস নিষ্পত্তিতে ফেরেন স্পিকার। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা স্থগিত রেখে বলেন, ৭১ বিধির গৃহীত নোটিসের ওপর স্থগিতকৃত আলোচনায় সংসদ ফিরছে।
এরপর জয়নুল আবদিন ফারুক তার নোটিস পড়েন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেন। পরে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নোটিসের জবাব দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সবশেষে কামরুজ্জামান কামরুলের নোটিসের জবাব দিতে গিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, আমি আগাগোড়াই উপস্থিত ছিলাম। প্রশ্নকর্তাই উপস্থিত ছিলেন না।
নোটিস নিষ্পত্তির পর আবার পয়েন্ট অব অর্ডারে কয়েকজন সংসদ সদস্য কথা বলেন। পরে আসরের নামাজের জন্য ৩০ মিনিটের বিরতি দেন স্পিকার। বিরতির পর আবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় ফেরে সংসদ।



