সংরক্ষিত নারী এমপিদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা: সরাসরি নির্বাচিতদের সমান অধিকার
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী দলগুলো ৬টি আসনের বিপরীতে একটি করে সংরক্ষিত নারী আসন পেয়ে থাকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপি ৩৬টি আসন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একটি আসন পাবে। প্রশ্ন উঠেছে, সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত ৩০০ আসনের এমপিদের মতো সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরাও কি একই বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পান?
সুবিধার আইনি ভিত্তি ও সমতা
সংরক্ষিত আসনের ৫০ জন নারী সংসদ সদস্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত বেতন-ভাতা ও নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। এসব সুবিধা নির্ধারিত হয়েছে ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩’ অনুযায়ী, যা বিভিন্ন সময়ে সংশোধন করা হয়েছে এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে হালনাগাদ হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, সংসদ সদস্য হিসেবে সংরক্ষিত এবং সরাসরি ভোটে নির্বাচিতদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যোগ্যতা এবং সুযোগ-সুবিধা সম্পূর্ণ একই রকম। একজন নির্বাচিত এমপি বেতন-ভাতাসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন এবং সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যরাও ঠিক একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
মাসিক বেতন ও ভাতার বিস্তারিত
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, একজন নারী সংসদ সদস্য প্রতি মাসে ৫৫ হাজার টাকা মূল বেতন পান। এর পাশাপাশি তিনি মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্বাচনি এলাকা ভাতা এবং ৫ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা পান। পরিবহণ খরচের জন্য মাসিক ৭০ হাজার টাকা পরিবহণ ভাতা প্রদান করা হয়, যার মধ্যে জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং চালকের বেতন অন্তর্ভুক্ত থাকে।
নির্বাচনি এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা অফিস ব্যয় ভাতা দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সংসদ সদস্যরা মাসে আরও কিছু ভাতা পান, যেমন ১ হাজার ৫০০ টাকা লন্ড্রি ভাতা এবং ৬ হাজার টাকা বিবিধ ব্যয় ভাতা, যা বাসনপত্র, বিছানাপত্র, টয়লেট্রিজসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য নির্ধারিত।
বিশেষ সুযোগ-সুবিধাসমূহ
সংসদ সদস্যদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- শুল্ক ও করমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা: একজন সংসদ সদস্য তার মেয়াদকালে সরকার নির্ধারিত শর্তে একটি গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করতে পারেন শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর ছাড়াই। পাঁচ বছর পর একই শর্তে আবার নতুন একটি গাড়ি আমদানির সুযোগও রয়েছে।
- ভ্রমণ সুবিধা: সংসদের অধিবেশন, কমিটির সভা ও দায়িত্বসংক্রান্ত কাজে যাতায়াতের জন্য আলাদা ভাতা পান। রেল, বিমান বা নৌপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ ভাতা দেওয়া হয়। দেশের ভেতরে যাতায়াতের জন্য বছরে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ভ্রমণ ভাতা অথবা সমমূল্যের ট্রাভেল পাস সুবিধাও দেওয়া হয়।
- চিকিৎসা সুবিধা: সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবার সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমমানের চিকিৎসা সুবিধা পান। পাশাপাশি মাসিক ৭০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয়।
- বীমা সুবিধা: নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সংসদ সদস্যদের জন্য সরকারিভাবে ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধা রাখা হয়েছে, যা দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়।
অতিরিক্ত সুবিধা ও ভাতা
সংসদ অধিবেশন, সংসদীয় কমিটির সভা বা দায়িত্বসংক্রান্ত অন্য কোনো কাজে দায়িত্বস্থলে অবস্থান করলে সংসদ সদস্যরা ৭৫০ টাকা দৈনিক ভাতা ও ৭৫ টাকা যাতায়াত ভাতা পেয়ে থাকেন। সংসদ অধিবেশন বা কমিটির সভায় উপস্থিত থাকলে সদস্যরা উপস্থিতির ভিত্তিতে প্রতিদিন ৮০০ টাকা দৈনিক ভাতা ও ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পান।
টেলিযোগাযোগ সুবিধার অংশ হিসেবে সংসদ সদস্যদের বাসভবনে সরকারি খরচে একটি টেলিফোন সংযোগ দেওয়া হয়, যার জন্য মাসিক ৭ হাজার ৮০০ টাকা টেলিফোন ভাড়া ও কল খরচ বাবদ ভাতা প্রদান করা হয়। প্রত্যেক সংসদ সদস্য বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত একটি ঐচ্ছিক অনুদান তহবিল ব্যবহার করতে পারেন, যা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যয় করার বিধান রয়েছে।
সংসদ সদস্যরা যেসব ভাতা পান, সেগুলো আয়করমুক্ত, অর্থাৎ এসব ভাতার ওপর কোনো আয়কর দিতে হয় না। এছাড়া বিগত সময়ে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় প্লটও পেয়েছেন এমপিরা, যা সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের জন্যও প্রযোজ্য।
সর্বোপরি, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নারী প্রতিনিধিত্বকে শক্তিশালী করে তোলে।



