জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির অনড় অবস্থান
জাতীয় সংসদের এলডি হলের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের সেই দিনটি এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিএনপির প্রথম বৈঠকের মধ্যাহ্নবিরতিতে একটি সূত্র জানিয়েছিল, আলোচনার পরিবেশ খুব একটা উষ্ণ হচ্ছে না। বিএনপি সংস্কার বিষয়ক মৌলিক প্রশ্নগুলোতে শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে। বৈঠক শেষে ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদের কারও কারও ব্যক্তিগত মন্তব্যে হতাশার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘সংস্কার’ শব্দটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষার ভাষা হয়ে উঠলেও ক্রমেই তা রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে। এই লড়াই মূলত রাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী কতটা ক্ষমতা ধরে রাখবেন, রাষ্ট্রপতি কতটা স্বাধীন হবেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কাদের হাতে থাকবে, সংসদ কি কেবল আনুষ্ঠানিক অনুমোদনদাতা থাকবে, নাকি সত্যিকার জবাবদিহির জায়গা হয়ে উঠবে, সংবিধান সংশোধন ভবিষ্যতে কতটা কঠিন হবে—এসব প্রশ্ন ঘিরে তৈরি টানাপোড়েন সংস্কার-আলোচনার গতিপথ নির্ধারণ করেছে।
সংস্কার কমিশনের গঠন ও প্রস্তাব
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে তারা ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেগুলো হলো: সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন।
২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি কমিশনগুলো তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কার্যকর ভারসাম্যের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর হুমকি। ক্ষমতার ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসকে পরিণত করেছে।’ এসব উদ্দেশ্য পূরণে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাব করা হয়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের যাত্রা
সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। কমিশন সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে এবং পাঁচটি কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এগুলোকে ছক আকারে সাজিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য ৩৭টি দলের কাছে পাঠানো হয়।
বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন, উচ্চকক্ষের গঠনপ্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সীমিত করা, একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান হতে পারবেন না—এ রকম বেশ কিছু প্রস্তাবে ভিন্নমত জানায় বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এ ধরনের প্রস্তাবগুলোর নীতিগত সমর্থন করেছিল।
এনসিসি নিয়ে বিতর্ক
সংবিধান সংস্কার কমিশনের মূল প্রস্তাব ছিল—এনসিসি হবে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দেওয়া হলে নিরপেক্ষ নিয়োগ হবে বলে মনে করা হয়েছিল। তবে বিএনপি ও তাদের মিত্র কিছু দল এ ধরনের কাউন্সিল গঠনের তীব্র বিরোধিতা করে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘বিএনপি এই প্রস্তাবের সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত নয়। এ ধরনের একটি কাঠামো করা হলে প্রধানমন্ত্রী পদের কোনো মূল্য থাকে না।’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এনসিসি গঠনের প্রস্তাব নিয়ে দ্বিতীয় পর্বে দলগুলোর সঙ্গে প্রথম আলোচনা করে ২০২৫ সালের ১৮ জুন। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বেশ কিছু দল এনসিসির বিষয়ে নীতিগত সমর্থন জানায়। তবে গঠনপ্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল তাদের।
বিএনপির শর্ত ও বিকল্প প্রস্তাব
২৫ জুনের বৈঠকে ঐকমত্য কমিশন এনসিসির পরিবর্তে ‘সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ’ দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করে। সেদিন বিএনপি জানায়, এক ব্যক্তি সারা জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন, এই প্রস্তাব তারা মেনে নেবে। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের শর্ত আছে। তা হলো সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের জন্য এনসিসি বা এ ধরনের কোনো কমিটি গঠনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করা যাবে না।
২২ জুলাই আলোচনায় নতুন প্রস্তাব দেয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেখানে নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ন্যায়পাল নিয়োগের জন্য সংবিধানে আলাদা বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়। ২৩ জুলাই আলোচনায় এই পদ্ধতিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়।
নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি
সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক এবং আরও ৯টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বিটিআরসিতে নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। যদিও গভর্নর ও বিটিআরসিতে নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি দেয় বিএনপিসহ ৮টি দল।
ক্ষমতার ভারসাম্য প্রশ্নে বিতর্ক
সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা একেবারে সীমিত হয়ে আসবে। কিন্তু এগুলোতে বিএনপির ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট আছে। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় এটা কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্নও উঠেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমদ তাঁর বিশ্লেষণে লিখেছেন, ‘সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে যেসব প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলের অপশাসনের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব সুপারিশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পদকেই একেবারে “গৌণ” করে ফেলা হয়েছে।’
শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান ছিল—তারা এসব ক্ষেত্রে নিয়োগের জন্য আলাদা আইন করবে। তবে সে আইনে কী থাকবে, কেমন হবে; তা এখন পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়নি। সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে অতীতে আওয়ামী লীগ যেভাবে নির্বাচন কমিশন নিয়োগে আইন করেছিল, সেভাবেই সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের বিধান করা হতে পারে।
কিন্তু সাংবিধানিক পদে নিয়োগ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ঘিরে এই দ্বন্দ্বেই বিতর্ক শেষ হয়নি; উচ্চকক্ষ, পিআর, নারী প্রতিনিধিত্ব, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নোট অব ডিসেন্ট এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চলে আরও কঠিন লড়াই। পুরো প্রক্রিয়া একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক এবং জটিল ছিল, যা রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো নতুন করে ভারসাম্যের প্রশ্নে এক দীর্ঘ দর-কষাকষির প্রতিফলন।



