পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সমীকরণ ওলটপালট হয়ে গেল ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে। যে ‘মুসলিম ভোট ব্যাংক’ তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ বলে পরিচিত ছিল, সেখানে এবার বড়সড় ফাটল ধরাল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। রাজ্যের ৭৪টি মুসলিম প্রধান আসনের মধ্যে ১৮টিতে পদ্ম শিবিরের জয় কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের এক নতুন ইঙ্গিত বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
আসন বণ্টনের চিত্র
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ৭৪ আসন মুসলিম প্রধান, যেখানে ৪০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ মুসলিম ভোটার। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই ৭৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূল একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে ৭১টি আসন জিতেছিল। বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ২টি ও আইএসএফ ১টি আসন। কিন্তু ২০২৬-এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিজেপির উত্থান ১৮টি মুসলিম প্রধান আসনে, অপরদিকে তৃণমূলের পতন ঘটে ৭১ থেকে কমে আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০-এ। এছাড়াও কংগ্রেস ২, সিপিএম ১, আইএসএফ ১ এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টি ২টি আসনে জয়ী হয়েছে।
জেলা ভিত্তিক বিশ্লেষণ
পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম প্রধান জেলা তিনটির মধ্যে মালদায় ১২টি আসনে ২০২১ সালে তৃণমূল ৮ ও বিজেপি ৪টি আসন পেয়েছিল। ২০২৬ সালে তৃণমূল ৬ ও বিজেপি ৬টি আসন পেয়েছে। মুর্শিদাবাদে ২২টি আসনে ২০২১ সালে তৃণমূল ২০ ও বিজেপি ২টি আসনে জিতেছিল। ২০২৬ সালে তৃণমূল ৮, বিজেপি ৯, কংগ্রেস ২, সিপিএম ১ ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টি ২টি আসন পেয়েছে। উত্তর দিনাজপুর জেলায় ৯টি আসনের মধ্যে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূল ৭ ও বিজেপি ২টি আসনে জিতেছিল। ২০২৬ সালে তৃণমূল ৫ ও বিজেপি ৪টি আসনে জয়লাভ করেছে।
তৃণমূলের ভোট ব্যাংকে ফাটলের কারণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ঝন্টু বরাইকের মতে, মুসলিম প্রধান এলাকায় বিজেপির এই সাফল্যের পিছনে কাজ করেছে একাধিক সূক্ষ্ম ও গভীর কারণ। প্রথমত, এতদিন সংখ্যালঘু ভোট একচেটিয়া তৃণমূলের দিকে যেত, কিন্তু এবার কংগ্রেস, সিপিএম এবং বিশেষ করে আইএসএফ ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির উপস্থিতিতে সেই ভোট বিভক্ত হয়েছে। এই চতুর্মুখী বা পঞ্চমুখী লড়াইয়ের পূর্ণ ফায়দা তুলেছে বিজেপি। অনেক আসনে জয়ের ব্যবধান খুব কম হলেও, বিরোধী ভোট ভাগ হওয়ার কারণে বিজেপি প্রার্থী বেরিয়ে গেছেন।
দ্বিতীয়ত, পরিবারতন্ত্র ও স্থানীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল ব্যাপক। মুর্শিদাবাদ ও মালদার মতো জেলাগুলোতে তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। কর্মসংস্থানের অভাব এবং গ্রামীণ দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়েছিলেন শ্রমিকদের একটি বড় অংশ, যাদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু। বিজেপির ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগান বা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছে অধিকাংশের মনে।
তৃতীয়ত, ঝন্টু বরাইক বলেন, বিজেপি এবার তাদের রণকৌশল কিছুটা বদলেছে। হিন্দুত্বের পাশাপাশি মুসলিম প্রধান এলাকায় তারা উন্নয়নের অভাবকে হাতিয়ার করেছিল। রাস্তাঘাট, পানীয় জল এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুফল নিয়ে তারা প্রচার চালায়। অন্যদিকে তৃণমূলের ‘ভয়ের রাজনীতি’র বদলে অনেকে স্থিতিশীলতা খুঁজেছেন।
ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন
দেখা গেছে, মালদায় ১২টি আসনের মধ্যে অর্ধেক অর্থাৎ ৬টি এখন বিজেপির দখলে। উত্তর দিনাজপুরেও বিজেপি তাদের শক্তি দ্বিগুণ করেছে। এই জেলাগুলোতে এনআরসি বা সিএএ নিয়ে ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি আর আগের মতো কাজ করেনি। বরং মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়া বা পরিচয় সংকটের চেয়ে স্থানীয় উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
মুর্শিদাবাদে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি দুটি আসন দখল করে চমক দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, সংখ্যালঘু ভোটাররা এখন কেবল তৃণমূল বা বাম-কংগ্রেসের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে রাজি নন। তারা নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব খুঁজছেন, যা পরোক্ষভাবে তৃণমূলের আধিপত্যকে দুর্বল করেছে।
রাজনৈতিক প্রভাব
২০২৬-এর এই ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ‘ভোটব্যাঙ্ক থিওরি’কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। মুসলিম প্রধান আসনে জয় শ্রীরাম ধ্বনি বা বিজেপির জয় জয়কার প্রমাণ করেছে যে, ভোটাররা এখন আর কোনও নির্দিষ্ট দলের ‘বাঁধা ভোট’ নন। তৃণমূলের দুর্গে এই ফাটল যদি আগামী দিনে আরও চওড়া হয়, তবে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।
বিজেপি কি সত্যিই মুসলিম হৃদয়ে জায়গা করে নিল, নাকি এটি স্রেফ বিরোধী ভোট বিভাজনের গাণিতিক জয়, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও দিনাজপুরের ফলাফল যে তৃণমূল, বাম, কংগ্রেসের কপালে চিন্তার ভাঁজকে আরও চওড়া করল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।



