গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত নাগরিক ও নির্বাচিত সরকারের মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি। এই চুক্তি অনুসারে সরকারের দায়িত্ব দেশের মানুষের দেখভাল করা। কেবল আইন তৈরি নয়, সে আইন যাতে রক্ষিত হয়, সে দায়িত্বও তাদের। কিন্তু এমন উদাহরণ মোটেই বিরল নয়, যেখানে আইন রক্ষার বদলে রাষ্ট্র নিজেই আইন ভঙ্গ করে। যার কথা ছিল রক্ষক হওয়ার, সে হয়ে ওঠে ভক্ষক।
রাষ্ট্র কীভাবে ভক্ষক, এমন তিনটি সাম্প্রতিক উদাহরণ নেওয়া যাক।
এক. বাংলাদেশের বালিশ–কাণ্ড
রূপপুর আণবিক কর্মসূচির আবাসিক প্রকল্পে সামান্য কয়েক শ টাকার বালিশ কেনা হয় প্রায় লাখ টাকায়। ট্রাক থেকে বাড়িতে তুলতে বালিশপ্রতি ব্যয় হয় হাজার পাঁচেক টাকা। এই বালিশ–কাণ্ডে রাষ্ট্রকে গুনতে হয়েছে বাড়তি কয়েক কোটি টাকা। মজার ব্যাপার হলো, সবকিছুই হয়েছে কাগুজে আইনকানুন মেনে। প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, টেন্ডার ডাকা হয়েছে, এমনকি কাজ শেষে নিয়মমতো হিসাব নিরীক্ষণও হয়েছে। রাষ্ট্রের নিয়োজিত কর্মকর্তাবৃন্দের তত্ত্বাবধানে, সম্মতিতে ও অংশগ্রহণে চোখের সামনে পুকুরচুরি হয়ে গেল। যাদের দায়িত্ব ছিল নজরদারির, তারা হয় কাজে গাফিলতি করেছে, অথবা হিসাব কষেই নিজেদের পকেট ভারী করেছে।
দুই. পাকিস্তানের কোহিস্তান কেলেঙ্কারি
পাকিস্তানের পাখতুনওয়ালা প্রদেশের কোহিস্তান কেলেঙ্কারি। উন্নয়নকাজের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, কিন্তু প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্তারা সরকারি অধিকর্তাদের যোগসাজশে কম করে হলেও কয়েক কোটি রুপি হাতিয়ে নেয়। নকল কোম্পানি, নকল কন্ট্রাক্টর। গার্বেজ বা ময়লা সরায় এমন এক ড্রাইভারের নাম রয়েছে, যাকে ১৬ লাখ ডলার পাওনা মেটানো হয়েছে। তদন্তের পর জানা গেল, সরকারের একদম মাথা থেকে জুতোর শুকতলা পর্যন্ত সর্বস্তরের কর্তারাই এই পুকুরচুরির সঙ্গে জড়িত।
তিন. ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্লাশ ফান্ড
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ‘স্লাশ ফান্ড’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিছুদিন আগে নিজেই তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। ২০১৯ সালে, যখন তিনি প্রেসিডেন্ট, সরকারের রাজস্ব বিভাগের একজন ঠিকাদার তাঁর আয়করের হিসাব পত্রিকায় ফাঁস করে দেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, এর ফলে তাঁর সম্মানহানি হয়েছে, অতএব ক্ষতিপূরণ বাবদ তিনি সরকারের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চান। তো, সেই ট্রাম্প এখন মামলা চালানোর বদলে মিটমাট করে নিয়েছেন। সরকার (অর্থাৎ তিনি নিজেই) সম্মত হয়েছে, বিচার বিভাগ ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের এক বিশেষ তহবিলের ব্যবস্থা করবে, যেখান থেকে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন লোকেরা ক্ষতিপূরণ পাবে। বলা হচ্ছে, ৬ জানুয়ারি ২০২১ সালে যেসব ট্রাম্প–সমর্থক কংগ্রেস ভবনে হামলা করার কারণে জেলজুলুমে পড়েছে, তারাও ক্ষতিপূরণ পেতে পারে। অন্য কথায়, এ হলো রাষ্ট্রের পয়সায় নিজের সমর্থকদের পকেট ভারী করার একটি অতি উত্তম ব্যবস্থা।
ব্যাপারটা এখানেই শেষ নয়। বিচার বিভাগের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসারে, এরপর কোনো সময়েই ট্রাম্প, তাঁর পরিবার বা তাঁর কোম্পানির বিরুদ্ধে আয়কর প্রশ্নে কোনো মামলা করা যাবে না। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে আয়কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে ১০০ মিলিয়ন ডলার জরিমানার মামলা চলছে, সেটিও তামাদি বলে গণ্য হবে।
স্যুটকেস থেকে স্প্রেডশিট
এখানে যে ‘স্যাম্পল’গুলো দেওয়া হলো, লক্ষ করে দেখুন, তার প্রতিটিতেই আপাতভাবে সব আইনকানুন মেনেই রাষ্ট্রের সম্পদ হাতানো হচ্ছে। আগে অবৈধ পথে হাতানো অর্থ স্যুটকেসে পাচার হতো, যেমন পাচার করেছিলেন ফিলিপাইনের মার্কোস, জায়েরের মবুতু বা নাইজেরিয়ার সানি আবাচা। আমাদের শেখ হাসিনাও যে কয়েকটি স্যুটকেস নিয়ে সটকে পড়েন, সেটিও এই তালিকায় ফেলা যায়।
এখন স্যুটকেসে টাকা ভরাটা একমাত্র পথ নয়। রাষ্ট্রের সম্পদ লোপাট করতে ব্যবহৃত হয় কম্পিউটার, স্প্রেডশিট, চতুর অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আইনজীবীদের। আগে টাকা হাতানো হতো টেবিলের নিচে হাত পেতে। এখন টাকা পাচার হয় ‘ওয়্যার ট্রান্সফারের’ মাধ্যমে। তবে যেভাবেই হোক, স্যুটকেসে ভরে বা ব্যাংক ট্রান্সফারে—এর কোনোটাই কর্তা ব্যক্তিদের সমর্থন না থাকলে এমন কাণ্ড ঘটত না।
পাবলিক বাস বনাম প্রাইভেট ট্যাক্সি
রাষ্ট্র কী তা বুঝতে আমরা পাবলিক বাসের একটি রূপক ব্যবহার করতে পারি। পাবলিক বাস এমন এক বাহন, যেখানে সব ধরনের যাত্রীই ধার্য ভাড়া দিয়ে নির্ধারিত পথে যাতায়াত করতে পারেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন কর্তাদের নির্দেশে সেই বাস পাবলিককে বহনের বদলে শুধু তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য ব্যবহৃত হয়। বাসের মালিক রাষ্ট্র, সে বাসের তেল সরকারি পয়সায় কেনা, কিন্তু তাতে বসার সুযোগ পান শুধু বিশেষ একধরনের মানুষ।
ট্রাম্প যে ‘স্লাশ ফান্ড’ দাবি করছেন, সেটি বিবেচনা করুন। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমে তহবিলটি গঠিত হবে, এর বরাদ্দ আসবে রাষ্ট্রের খাজাঞ্চিখানা থেকে, কিন্তু এর সুবিধা পাবে শুধু তারা, ট্রাম্প যাদের নিজের লোক ভাবেন।
ব্যাপারটা এতটা অভাবিত যে ট্রাম্পের দলের লোকেরাই বলছেন, এমন কাজ কীভাবে করা সম্ভব। রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল বলেছেন, এটি শুধু গর্দভের মতো কাজই নয়, এটি অনৈতিকও বটে।
অপরাধের ‘ইকোসিস্টেম’
এই যে আমাদের চোখের সামনে আস্ত পুকুরচুরি হয়ে যাচ্ছে, তার জন্য দোষী কি শুধু গুটিকয় মাথাভারী কর্তাব্যক্তি?
জার্মান দার্শনিক হানাহ আরেন্ডট বলেছেন, না, কমবেশি আমরা সবাই অপরাধী। অপরাধ জেনেও আমরা তার প্রতিবাদ করি না, ধরে নিই প্রতিবাদে কোনো কাজ হবে না, অথবা এটাই ‘সিস্টেম’। ফলে চুপ থাকি। এতে ক্ষমতাধরদের হাতে সংঘটিত ভয়ানক অপরাধও ‘স্বাভাবিক’ হয়ে পড়ে। আর এভাবে সাধারণ নাগরিক তার অজ্ঞাতে বা অনিচ্ছায় সে অপরাধের অংশীদার হয়ে যায়। আরেন্ডট বলেছেন, ক্ষমতাধরের সংঘটিত অপরাধের চেয়েও বড় বিপত্তি ঘটে যখন দেশের মানুষ মেনে নেয় যে দেশের প্রেসিডেন্ট, সরকারের মন্ত্রী অথবা থানার দারোগা চুরি করবেই। আর এতেই ঘটে যায় মহা সর্বনাশ। শুধু অর্থ লোপাট হলে একটা দেশ বা সমাজ নিজেকে সামলে নিতে পারে, কিন্তু তার নৈতিক বল যদি একবার খোয়া যায়, তা ফেরত পাওয়া কঠিন।
অমর্ত্য সেন তাঁর ডেভেলপমেন্ট এজ ফ্রিডম গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ ঘটে যখন দেশের অধিকাংশ মানুষ তার নাগরিক সমাজ-রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া অপশাসন নিয়ে কথা বলা বা প্রতিবাদ করা থামিয়ে দেয়। গৃহকর্তা যখন দেখেও না দেখেন বা কিছু করার নেই বলে হাল ছেড়ে দেন, তখন চোর তো সিঁধ কাটবেই।
আরেক বিপত্তি ঘটে যখন নেতার প্রতি আনুগত্য থেকে মস্ত অপরাধকেও তাঁর সমর্থকেরা জায়েজ বলে মেনে নেন। ট্রাম্পের কথা দেখুন। হেন অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি, অথচ তারপরেও নিজের অনুগত সমর্থকদের মধ্যে তাঁর সমর্থনে বিন্দুমাত্র চিড় ধরেনি। তিনি নিজেই বলেছেন, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে খুন করলেও আমার সমর্থন মোটেই কমবে না। শুধু ট্রাম্প কেন, এ কথা সত্যি নরেন্দ্র মোদির মতো জাতীয়তাবাদী নেতার বেলাতেও। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও শেখ হাসিনার আওয়ামী ফেসবুক বাহিনী যে হারে তাঁর পক্ষে সাফাই গেয়ে চলেছে, তাতে তাঁকেও এই তালিকাভুক্ত করা যায়।
জর্জ অরওয়েলের উপদেশ এখানে স্মরণ করা যাক। তাঁর অ্যানিমেল ফার্ম প্রহসন থেকে আমরা জানি, একনায়ক একা নন, তার রয়েছে বিস্তর অনুগত সাঙ্গপাঙ্গ, তার ইকোসিস্টেম। নেতার বিলানো সামান্য রুটির টুকরার জন্য যেকোনো সময়ে নিজেদের আত্মা বিক্রিতে তারা প্রস্তুত।
ট্রাম্পের মতো নেতা আপাতভাবে যত শক্তিধর মনে হোক না কেন, তাঁর শক্তির উৎস এই ‘ইকোসিস্টেম’। তিনি যদি হুক্কা বলেন, তো এই ইকোসিস্টেমের সদস্যরা সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠেন হুক্কাহুয়া।
কীভাবে আসবে পরিবর্তন
হানাহ আরেন্ডট, জর্জ অরওয়েল ও অমর্ত্য সেন—তাঁরা সবাই আমাদের সতর্ক করেছেন, অপশাসন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয় মানুষের মন থেকে। স্বৈরতন্ত্র কেবল কারাগার বা অপপ্রচারের মাধ্যমে টিকে থাকে না। সেটি টিকে থাকে যখন কোনো দেশের নাগরিক তাদের চিন্তা করার, মনে রাখার এবং কথা বলার ক্ষমতা বিসর্জন দেয়। এসবই সে করে ভয় থেকে। কিন্তু একবার সে ভয় ভেঙে গেলে কোনো প্রাসাদই আর অভেদ্য থাকে না। স্বৈরশাসকদের জন্য বাকি থেকে শেষ অপমান: অন্ধকারাচ্ছন্ন মোটর শোভাযাত্রা, অপেক্ষমাণ বিমান ও স্যুটকেসগুলো।
হাসান ফেরদৌস লেখক ও প্রাবন্ধিক



