সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী সরকারি কর্মকর্তাদের প্রটোকল সংস্কৃতি, আপ্যায়নের নামে অপচয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এক শ্রেণির ঊর্ধ্বতন আমলার অনৈতিক আচরণ জুনিয়র কর্মকর্তাদের দুর্নীতির পথে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রশাসনের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করছে।
ফেসবুক পোস্টে যা বললেন সাবেক সচিব
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, একজন আমলাকে তার বাহ্যিক চাকচিক্য, পোশাক কিংবা বক্তৃতা দিয়ে বিচার করা যায় না। সততা না থাকলে উচ্চশিক্ষা বা বিভিন্ন ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই।
তার ভাষ্য, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাপ্তরিক বা ব্যক্তিগত সফরে গেলেই অধীনস্থ কর্মকর্তাদের ওপর প্রটোকল, আপ্যায়ন, গাড়ির ব্যবস্থা, ফুলের তোড়া, ভোজ ও উপহারের চাপ সৃষ্টি হয়। এসব আয়োজন করতে গিয়ে অনেক সময় চাঁদা, ঘুষের অর্থ কিংবা অফিস থেকে বেআইনিভাবে তোলা অর্থ ব্যবহার করা হয়।
জুনিয়র কর্মকর্তাদের ওপর চাপ
তিনি বলেন, পদোন্নতি বা চাকরি রক্ষার স্বার্থে অধিকাংশ জুনিয়র কর্মকর্তা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন না। বরং চাকরির শুরু থেকেই তারা এমন অনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য হন, যা একসময় বড় ধরনের দুর্নীতির ভিত্তি তৈরি করে।
২০২০ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ
পোস্টে একটি ঘটনার উল্লেখ করে সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব দাবি করেন, ২০২০ সালে তৎকালীন বিদ্যুৎ সচিব ব্যক্তিগত সফরে পরিবারের ১৭ সদস্যকে নিয়ে ফেনী হয়ে খাগড়াছড়ি যান। ওই সফরের প্রটোকল, যানবাহন ও আপ্যায়নের দায়িত্ব পড়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ফেনী কার্যালয়ের ওপর। শুধু আপ্যায়ন বাবদ প্রায় অর্ধ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সফরটি সরকারি না হওয়ায় পিডিবির কুমিল্লা অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রটোকলে উপস্থিত ছিলেন না। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালীন সচিব তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন এবং পরে সেই আদেশ কার্যকরও হয়। যদিও ওই কর্মকর্তা সেদিন ঢাকায় একটি প্রকল্প-সংক্রান্ত বৈঠকে অংশ নিচ্ছিলেন।
চট্টগ্রাম সফরের আরেক অভিযোগ
এ ছাড়া তৎকালীন বিদ্যুৎ সচিব চট্টগ্রাম সফরে গেলে সরকারি পুলের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও পিডিবির প্রধান প্রকৌশলীর গাড়ি দিনরাত নিজের ব্যবহারে রাখতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নৈতিকতার সংকট ও সমাধানের আহ্বান
মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী বলেন, এসব ঘটনা হয়তো বড় অর্থনৈতিক দুর্নীতির তুলনায় ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু নৈতিকতার বিচারে এগুলো রাষ্ট্রের জন্য বড় সংকটের প্রতীক। প্রটোকল ও আপ্যায়নের নামে সরকারি কর্মকর্তাদের সময়, শ্রম ও মেধার অপচয় হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি প্রশাসনে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু সভা-সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে পরিবর্তন আসবে না। একটি দেশের উন্নতি নির্ভর করে সৎ, বিশ্বাসযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন আমলাতন্ত্রের ওপর।



